Dr. Prosenjit Datta

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে এটি করা হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি আর দশটা অপারেশনের মতই একটি অপারেশন।

সারকামসিশন বা খাৎনা আসলে কী?

সুন্নতে খাৎনা বা সারকামসিশন আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত একটি বিষয়। ধর্মীয় বা সামাজিক কারণে এটি করা হলেও, চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এর অনেক স্বাস্থ্যগত সুবিধা রয়েছে। সহজ ভাষায় বলতে গেলে, সারকামসিশন হলো ছেলে শিশুর পুরুষাঙ্গের সামনের দিকের অতিরিক্ত চামড়া (Foreskin) কেটে বাদ দেওয়ার একটি ছোট সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। এই চামড়াটি পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশকে (Glans) ঢেকে রাখে। অনেক বাবা-মা মনে করেন এটি হয়তো একটি সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার বিষয়, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই এটি করানো যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্জারি। সঠিক পরিবেশে এবং সঠিক বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে এটি করা হলে শিশুর ভবিষ্যতের অনেক জটিল শারীরিক সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব।

কেন এবং কখন চিকিৎসকরা খাৎনা করার পরামর্শ দেন?

ধর্মীয় কারণের বাইরেও অনেক সময় ডাক্তাররা স্বাস্থ্যগত কারণে খাৎনা করার পরামর্শ দেন। এর প্রধান একটি কারণ হলো ‘ফাইমোসিস’ (Phimosis)। ফাইমোসিস হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষাঙ্গের সামনের চামড়াটি অতিরিক্ত টাইট বা আঁটসাঁট থাকে, যার ফলে চামড়াটি কোনোভাবেই পেছনের দিকে টানা যায় না। এছাড়া ‘ব্যালানোপসথাইটিস’ (Balanoposthitis) নামক একটি সমস্যা আছে, যেখানে পুরুষাঙ্গের মাথার দিকে ইনফেকশন হয়ে বারবার পুঁজ জমে এবং ফুলে যায়। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে বারবার প্রস্রাবে ইনফেকশন (UTI) হওয়ার প্রবণতা থাকে। মূলত এই অতিরিক্ত চামড়ার নিচে ময়লা ও জীবাণু জমে এই ইনফেকশনগুলো তৈরি হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, স্বাস্থ্যগত এই সমস্যাগুলো থেকে শিশুকে স্থায়ীভাবে মুক্ত করতে সারকামসিশন বা খাৎনাই হলো সবচেয়ে কার্যকরী বৈজ্ঞানিক সমাধান।

বাবা-মা কীভাবে বুঝবেন শিশুর ফাইমোসিস বা ইনফেকশন আছে?

শিশুর প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো সমস্যা আছে কি না, তা বাবা-মাকে খুব সতর্কতার সাথে খেয়াল করতে হয়। আপনার শিশু যদি প্রস্রাব করার সময় প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে বা ব্যথায় কুঁচকে যায়, তবে সতর্ক হতে হবে। ফাইমোসিসের সবচেয়ে বড় লক্ষণ হলো, শিশু যখন প্রস্রাব করে তখন পুরুষাঙ্গের সামনের চামড়াটি ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায়। কারণ প্রস্রাব সহজেই বের হতে পারে না, চামড়ার ভেতরে জমে যায় এবং পরে ফোঁটা ফোঁটা করে বের হয়। অনেক সময় প্রস্রাবের রাস্তায় লালচে ভাব দেখা যায়, একটু হাত লাগলেই শিশু ব্যথা পায় এবং কখনো কখনো সেখান থেকে সাদা বা হলদেটে পুঁজ বের হতে দেখা যায়। বারবার এমন হলে শিশুর জ্বরও আসতে পারে। এই লক্ষণগুলো দেখলে বুঝতে হবে আপনার শিশুর দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।

চিকিৎসা পদ্ধতি: চিকিৎসা ব্যবস্থা কেমন হয়ে থাকে?

সারকামসিশন বা খাৎনা একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত সূক্ষ্ম সার্জারি। আজকাল এটি অত্যন্ত আধুনিক ও নিরাপদ উপায়ে করা হয়। সাধারণত দুই ধরনের পদ্ধতিতে এটি করা যায়। একটি হলো ‘ওপেন সার্জারি’, যেখানে সার্জন অত্যন্ত নিপুণভাবে অতিরিক্ত চামড়াটি কেটে বিশেষ সুতা দিয়ে সেলাই করে দেন, যা পরে নিজে থেকেই গলে যায়, কাটার প্রয়োজন হয় না। আরেকটি আধুনিক পদ্ধতি হলো ‘প্লাস্টিবেল’ (Plastibell) বা রিং পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে একটি ছোট প্লাস্টিকের রিং চামড়ার ভেতরে বসিয়ে সুতা দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। কয়েকদিন পর রিংটি চামড়াসহ নিজে থেকেই খসে পড়ে। নবজাতক বা ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত লোকাল অ্যানেসথেসিয়া (যে স্থানে সার্জারি হবে শুধু সেই স্থান অবশ করে) দিয়ে এটি করা হয়। তবে শিশু একটু বড় হলে এবং বেশি ভয় পেলে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে (জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া) ব্যথামুক্তভাবে এই অপারেশন করা হয়, যাতে শিশুর মনে কোনো ভীতি বা ট্রমা তৈরি না হয়।

চিকিৎসা না করালে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?

ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের রাস্তার ইনফেকশন থাকলে এবং সঠিক সময়ে খাৎনা না করালে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। প্রস্রাব ঠিকমতো বের হতে না পারার কারণে প্রস্রাবের থলিতে অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং সেই চাপ উল্টোদিকে কিডনির দিকে ছড়িয়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে শিশুর কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এছাড়া বারবার ইনফেকশনের কারণে পুরুষাঙ্গের চামড়া স্থায়ীভাবে সংকুচিত হয়ে প্রস্রাবের রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো জরুরি অবস্থাও তৈরি হতে পারে, যাকে প্যারাফাইমোসিস (Paraphimosis) বলা হয়।

খাৎনার পর শিশুর সুস্থতা

খাৎনা অত্যন্ত নিরাপদ একটি প্রক্রিয়া। সঠিক নিয়মে বিশেষজ্ঞ সার্জন দ্বারা সার্জারি করানো হলে শিশু খুব দ্রুত, সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যায়। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রস্রাবে ইনফেকশন বা পুরুষাঙ্গের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়।

পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ভালোবাসার সাথে সঠিক সিদ্ধান্ত

আপনার সোনামণির এই গুরুত্বপূর্ণ সার্জারিটি কখনোই হাতুড়ে ডাক্তার বা হাজামের হাতে তুলে দেবেন না। সামান্য ভুলের কারণে আপনার শিশুর সারাজীবনের কান্না ও বিকলাঙ্গতার কারণ হতে পারে। নিরাপদ পরিবেশ এবং বিশেষজ্ঞের হাতের স্পর্শই আপনার শিশুর প্রাপ্য।

পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা

একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন শিশুর বয়স, মানসিক অবস্থা এবং শারীরিক গঠন বিবেচনা করে সবচেয়ে নিরাপদ ও ব্যথামুক্ত উপায়ে খাৎনা সম্পন্ন করেন। তাঁর নিখুঁত অস্ত্রোপচার আপনার সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং কসমেটিক্যালি পারফেক্ট গঠন নিশ্চিত করে।

Scroll to Top