শিশুদের নিরাপদ খতনা (Safe Circumcision) এবং ফাইমোসিস (Phimosis): লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা
সুন্নতে খাৎনা বা সারকামসিশন আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত একটি বিষয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খতনা ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে করা হলেও কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণেও খতনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মনে খতনা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকে— এই লেখায় শিশুদের খতনা সম্পর্কে অভিভাবকদের জানা প্রয়োজন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো। খতনা (Circumcision) কি ? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, খতনা বা Circumcision হলো পুরুষ শিশুর লিঙ্গের মাথা (Glans Penis) ঢেকে রাখা অতিরিক্ত চামড়া বা Foreskin/Prepuce-এর একটি অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা। এই চামড়াটি পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশকে (Glans) ঢেকে রাখে। অনেক বাবা-মা মনে করেন এটি হয়তো একটি সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার বিষয়, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই এটি করানো যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্জারি। ফাইমোসিস (Phimosis) কি ? ফাইমোসিস (Phimosis) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষাঙ্গের সামনের দিকের চামড়াটি অতিরিক্ত টাইট বা সংকুচিত থাকে, যার ফলে চামড়াটি পেছনের দিকে টানা যায় না। শিশুদের জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ঠিক না হলে বা প্রস্রাবে সমস্যা তৈরি করলে তখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ছবিঃ ফাইমোসিস ও প্যারাফিমোসিস লক্ষণ ও উপসর্গ ? খতনা সাধারণত সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিন হিসেবে করা হয়। তবে যদি আপনার শিশুর ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখতে পারেন: খতনা কতটা প্রচলিত? খতনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-প্রধান দেশে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে খতনা শুধু ধর্মীয় প্রথা নয়—এটি একটি সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। তাই কোথায়, কখন এবং কার মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে—এসব বিষয় শিশুর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জনের মাধ্যমে এখন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত ও নিরাপদে শিশুর খতনা করানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই কখন এবং কেন শিশুর খতনা করানো জরুরি। কেন খতনা করা হয়? খতনা করার কারণকে সাধারণভাবে তিন ভাগে দেখা যায়। ১. ধর্মীয় কারণ বাংলাদেশে ছেলে শিশুর খতনার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি। ২. সামাজিক বা ব্যক্তিগত কারণ কিছু পরিবার ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে খতনা করানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৩. চিকিৎসাগত কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণে খতনা প্রয়োজন হতে পারে। যেমন— কোন বয়সে খতনা করা ভালো? এটি অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। খতনার জন্য সবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট “সেরা বয়স” নেই। খতনার উপযুক্ত সময় নির্ভর করে— নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থানীয় অবেদন (Local Anaesthesia) ব্যবহার করে খতনা করা সম্ভব হতে পারে। বড় শিশুর ক্ষেত্রে শিশুর সহযোগিতা, ভয় এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যানেস্থেসিয়ার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই “অমুক বয়সেই খতনা করতেই হবে”—এমন কোনো একক নিয়ম নেই। খতনার আগে শিশুকে কি পরীক্ষা করতে হয়? সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে খতনার আগে চিকিৎসক শিশুকে পরীক্ষা করে দেখবেন— রক্ত পরীক্ষা কি সব শিশুর জন্য দরকার? স্বাভাবিকভাবে সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিনভাবে সব ধরনের রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে শিশুর অতিরিক্ত রক্তপাতের ইতিহাস, রক্তক্ষরণজনিত রোগের পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। তবে ঝুঁকি এড়াতে সাধারণত কিছু রুটিন পরীক্ষা করে নেওয়া উচিৎ। যেমন – রক্ত রোগ হিমোফিলিয়া এবং খতনা? হিমোফিলিয়া এমন একটি রক্ত রোগ যেখানে রক্ত পরা বন্ধ হতে অনেক সময় লাগে। এটি একটি জেনেটিক রোগ যেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে যে ফ্যাক্টরগুলো লাগে তার মধ্যে ১টি ফ্যক্টর (ফ্যাক্টর ৮/৯) জন্মগতভাবে অনুপস্থিত অথবা অতিসল্প মাত্রায় থাকে। সাধারণত ছেলে শিশুরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়। যদি কোন হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুর খতনা করাতে চায় তাহলে অবশ্যই শিশু সার্জন এবং রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। তাই, খতনা পরবর্তী জটিলতা এবং চিকিৎসা ব্যয়, উভয়ই মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ। কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে খতনা করার আগে বিশেষ সতর্কতা দরকার? কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সরাসরি খতনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে— লিঙ্গের অন্য কোনো জন্মগত অস্বাভাবিকতা থাকলেও আগে শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অস্ত্রোপচারে foreskin-এর চামড়া প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর লিঙ্গের গঠন অস্বাভাবিক মনে হলে আগে শিশু সার্জনকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে তারপর খতনার সিদ্ধান্ত নিন। ছবিঃ হাইপোসপেডিয়াস – সাধারণভাবে খৎনা করা যেখানে উচিৎ নয়। খতনায় কি ধরনের Anesthesia (অবেদন) ব্যবহার করা হয় ? খতনার সময় চিকিৎসক শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের যেকোন একটি anesthesia ব্যবহার করতে পারেন — ছবিঃ Local Anesthesia VS General Anesthesia – দুইটাই নিরাপদ পদ্ধতি। শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা হয় কোনটা বেশি ভাল হবে। খতনার পরে কি ব্যাথা হয় ? হ্যাঁ, ব্যথা হতে পারে, কারণ খতনা একটি অস্ত্রোপচার। তবে যথাযথ ব্যথানিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশুর অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় খতনার সময় কার্যকর ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “বাচ্চা ছোট, তাই ব্যথা বুঝবে না”—এই ধারণা ভুল। শিশুর ব্যথা অনুভূতি আছে এবং খতনার সময় যথাযথ pain relief দেওয়া উচিত। খতনার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জটিলতা কি কি ? যদিও খতনা সাধারণত নিরাপদ একটি ছোট অস্ত্রোপচার, তবুও অন্য যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে- সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এবং যথাযথ ব্যথা নাশক ব্যবহার করে করলে গুরুতর জটিলতা বিরল। ছবিঃ দূর্ভাগ্যজনক কিন্ত বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা। “হাজাম”-নামক বিভীসিকার শিকার কিছু কমলমতি বালক। ভিডিওঃ আপনি যদি অভিভাবক হন তাহলে কাকে দায়ী করবেন এর জন্য? এই শিশুকে, ‘হাজাম’-কে, নাকি নিজেকে? খতনা কীভাবে করা হয় ? খতনার বিভিন্ন surgical technique রয়েছে। পদ্ধতি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং সার্জনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে – খতনার কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো? অভিভাবকরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন— “কোন ডিভাইস/পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো?”বাস্তবে একটি পদ্ধতি সব শিশুর জন্য সেরা নয়। বিভিন্ন বয়স ও পরিস্থিতিতে বিভিন্ন surgical technique বা device ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিশু সার্জন বাচ্চার সকল বিষয় বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিটি নির্বাচন করেন। শুধু “দ্রুত” বা “কম খরচে” হওয়াই ভালো খতনার মাপকাঠি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— প্রশিক্ষিত চিকিৎসক + সঠিক রোগী নির্বাচন + জীবাণুমুক্ত পরিবেশ + যথাযথ ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ + সঠিক ফলো-আপ। অপারেশনের পর শিশুর কি কি স্বাভাবিক লক্ষণ হতে পারে? খতনার পর কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক। যেমন – এসব সাধারণত ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে রক্তপাত বন্ধ না হলে, প্রস্রাব না হলে বা জ্বর/পুঁজ হলে তা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। খতনার পর শিশুর যত্ন কীভাবে করবেন? খতনার পর কতদিনে শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়? সুস্থ হতে শিশুভেদে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। সাধারণভাবে— খতনার পর কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন? নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন— 🚨 রক্তপাত বন্ধ না হওয়া 🚨 বারবার বা বেশি পরিমাণে রক্ত পড়া 🚨 শিশুর প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাব করতে খুব কষ্ট হওয়া 🚨 অতিরিক্ত ফোলা 🚨 পুঁজ
