Dr. Prosenjit Datta

Author name: Prosenjit Datta

Awareness

শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia in Children): লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা

আপনার শিশুর কুঁচকিতে (Groin) বা অণ্ডকোষের কাছে হঠাৎ কোনো ফোলা অংশ দেখে ভয় পাচ্ছেন? বাবা-মা হিসেবে এমন দৃশ্য দেখে দুশ্চিন্তা হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। তবে আশার কথা হলো, শিশুদের কুঁচকির হার্নিয়া (Inguinal Hernia) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা এবং সঠিক সময়ে একজন পেডিয়াট্রিক সার্জনের চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ ও নিরাপদে নিরাময়যোগ্য। চলুন জেনে নিই এই সমস্যাটি কেন হয় এবং কখন আপনার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ✅ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি অত্যন্ত সাধারণ অস্ত্রোপচারজনিত রোগ। ✅ ছেলে শিশুদের মধ্যে এটি মেয়ে শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। ✅ হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না। ✅ সময়মতো অপারেশন করলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। ✅ হার্নিয়া আটকে গেলে এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ইনগুইনাল হার্নিয়া কি? ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পেটের ভেতরের কোনো অংশ—সাধারণত অন্ত্রের একটি অংশ—পেটের দেয়ালের একটি দুর্বল বা খোলা পথ দিয়ে কুঁচকির দিকে বেরিয়ে আসে। শিশুর কান্না, কাশি, হাসি বা চাপ দেওয়ার সময় এই ফোলা আরও স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক সময় শিশুটি শান্ত হয়ে গেলে বা ঘুমিয়ে পড়লে ফোলাটি আবার নিজে থেকেই ভেতরে চলে যায়। এই কারণেই অনেক অভিভাবক প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না। কেন ইনগুইনাল হার্নিয়া হয়? শিশুর শরীর মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ (Testis) পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অণ্ডথলিতে নেমে আসে। এই নামার সময় একটি ছোট পথ (Processus Vaginalis) তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবে জন্মের আগে বা জন্মের কিছুদিনের মধ্যে এই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তাহলে সেই পথ দিয়ে অন্ত্র বা পেটের অন্যান্য অংশ নিচে নেমে এসে হার্নিয়া তৈরি করতে পারে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি জন্মগত পথ খোলা থাকলে ইনগুইনাল হার্নিয়া হতে পারে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুর ইনগুইনাল হার্নিয়া জন্মগত (Congenital)। ইনগুইনাল হার্নিয়ার লক্ষণ কি? বাবা-মায়েরা সাধারণত শিশুর গোসল করানো বা ডায়াপার পরানোর সময় এই সমস্যাটি প্রথম খেয়াল করেন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো: বিপজ্জনক লক্ষণ (Danger Signs) কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন? চিকিৎসা না করলে কী কী জটিলতা হতে পারে? অনেকেই ভাবেন— “বাচ্চা একটু বড় হলে দেখবো।” এটি সবসময় নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়। চিকিৎসা না করলে হতে পারে— এটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনগুইনাল হার্নিয়া শুধুমাত্র শিশুর ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা (Clinical Examination) করেই নির্ণয় করা যায়। আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) কি সবসময় দরকার? উত্তর হলো “না”। অনেক অভিভাবক মনে করেন আল্ট্রাসনোগ্রাফি ছাড়া হার্নিয়া ধরা যায় না। বাস্তবে, অভিজ্ঞ শিশু সার্জনের শারীরিক পরীক্ষাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন হতে পারে, যেমন— ইনগুইনাল হার্নিয়ার চিকিৎসা কী? ইনগুইনাল হার্নিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো অপারেশন। ওষুধে কি হার্নিয়া ভালো হয়? উত্তর হলো “না”। কোনো ওষুধ, সিরাপ, ব্যায়াম বা মালিশ করে হার্নিয়া ভালো হয় না। হার্নিয়া বেল্ট বা বেল্ট ব্যবহার করা উচিত? না। শিশুদের ক্ষেত্রে হার্নিয়া বেল্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয় না। এতে রোগ সারে না এবং কখনও কখনও জটিলতা বাড়তে পারে। কখন অপারেশন করা উচিত? রোগ নির্ণয় হওয়ার পর সাধারণত যত দ্রুত সুবিধাজনক সময়ে সম্ভব অপারেশন করা উচিত। কারণ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার (Incarceration) ঝুঁকি বাড়ে। অপারেশন সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— “এত ছোট বাচ্চার অপারেশন কি নিরাপদ?” উত্তর হলো—হ্যাঁ। বর্তমানে শিশুদের জন্য আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া ও সার্জিক্যাল প্রযুক্তির কারণে ইনগুইনাল হার্নিয়ার অপারেশন অত্যন্ত নিরাপদ এবং সফল। অপারেশনের নাম কি এবং কি কি উপায়ে করা যায়? হার্নিয়ার অপারেশনের নাম “হার্নিয়োটমি”। এটা ছোট্ট একটু কেটে (open) অথবা পেটে ছোট্ট ১/২/৩ টি ছিদ্র করে (laparoscopy) করা যায়। ল্যাপারোস্কোপি হচ্ছে আধুনিকতর চিকিৎসা পদ্ধতি। Open অপারেশনে কি করা হয়? অপারেশন কতক্ষণ লাগে? সাধারণত ৩০–৬০ মিনিট। অজ্ঞান করা কি নিরাপদ? অভিজ্ঞ শিশু অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া অত্যন্ত নিরাপদ। শিশুকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হয়? বেশিরভাগ শিশু একই দিন বা পরদিন বাড়ি যেতে পারে। অপারেশনের পরে শিশুর যত্ন অপারেশনের পর সঠিক যত্ন নিলে শিশুর সুস্থ হতে সুবিধা হয়। খাবারঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবার শুরু করা যায়। গোসলঃ ক্ষত শুকানো পর্যন্ত চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। ব্যথাঃ ক্ষতের যত্নঃ খেলাধুলাঃ প্রচলিত ভুল ধারণা (মিথ বনাম সত্য) ❌ মিথ ১: হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়। ✅ সত্য: শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া সাধারণত নিজে নিজে ভালো হয় না। ❌ মিথ ২: মালিশ করলে হার্নিয়া সেরে যায়। ✅ সত্য: মালিশে হার্নিয়া ভালো হয় না, বরং ক্ষতি হতে পারে। ❌ মিথ ৩: অপারেশন করলে শিশু দুর্বল হয়ে যাবে। ✅ সত্য: সফল অপারেশনের পর অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। ❌ মিথ ৪: যত বড় হবে তত অপেক্ষা করা ভালো। ✅ সত্য: অযথা দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ❌ মিথ ৫: হার্নিয়া হলে সবসময় ব্যথা থাকবে। ✅ সত্য: অনেক শিশুর কোনো ব্যথাই থাকে না। অভিভাবকদের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ) ১। হার্নিয়া কি ওষুধে ভালো হয়? > না। ২। অপারেশন কি খুব ব্যথার? > আধুনিক ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ব্যথা অনেক কম থাকে। ৩। অপারেশনের পর আবার হার্নিয়া হতে পারে? > সফল অপারেশনের পর পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ৪। দুই পাশেই কি হার্নিয়া হতে পারে? > হ্যাঁ। ৫। অপারেশনের জন্য কি রক্ত লাগে? > না। ৬। অপারেশনের পর সেলাই কাটতে হয়? > না। বর্তমানে এমন সেলাই ব্যবহার করা হয় যা নিজে থেকেই গলে যায়। ৭। আবার কি একই জায়গায় হতে পারে? > পারে, তবে অত্যন্ত বিরল। ৮। হার্নিয়া কি জরুরি অপারেশন? > সবসময় নয়। তবে হার্নিয়া আটকে গেলে জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। সংক্ষেপে মনে রাখুন ✔ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি সাধারণ রোগ। ✔ এটি নিজে নিজে ভালো হয় না। ✔ ওষুধ বা মালিশে এটি সারে না। ✔ সময়মতো অপারেশনই স্থায়ী চিকিৎসা। ✔ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে গিয়ে জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে। ✔ দ্রুত চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। শিশু সার্জন ডা. প্রসেনজিৎ দত্তের পরামর্শ একজন শিশু সার্জন হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়, অনেক অভিভাবক প্রথমে কুঁচকির ফোলাকে গুরুত্ব দেন না, কারণ শিশুর কান্না থামলে ফোলাটিও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এটি নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আপনার শিশুর কুঁচকিতে যদি বারবার ফোলা দেখা যায়, বিশেষ করে কান্না বা কাশি দিলে, তাহলে দেরি না করে একজন শিশু সার্জনের পরামর্শ নিন। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও পরিকল্পিত চিকিৎসা অধিকাংশ জটিলতা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে। লেখক পরিচিতি ডা. প্রসেনজিৎ দত্তএমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)এমএস (শিশু সার্জারি) শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ডা. প্রসেনজিৎ দত্ত নবজাতক, শিশু ও কিশোরদের বিভিন্ন জন্মগত ও অর্জিত অস্ত্রোপচারজনিত রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত। তাঁর বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ইনগুইনাল হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, অণ্ডকোষ না নামা (Undescended Testis), নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি, শিশুদের ইউরোলজিক্যাল সমস্যা এবং মিনিমালি ইনভেসিভ (ল্যাপারোস্কোপিক) শিশু সার্জারি। তিনি শিশু হার্নিয়ার অপারেশনে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ।

A family gathering is happening on the occasion of a circumcision ceremony of the youngest male memeber of the family
Awareness

শিশুদের নিরাপদ খতনা (Safe Circumcision) এবং ফাইমোসিস (Phimosis): লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা

সুন্নতে খাৎনা বা সারকামসিশন আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত একটি বিষয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খতনা ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে করা হলেও কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণেও খতনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মনে খতনা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকে— এই লেখায় শিশুদের খতনা সম্পর্কে অভিভাবকদের জানা প্রয়োজন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো। খতনা (Circumcision) কি ? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, খতনা বা Circumcision হলো পুরুষ শিশুর লিঙ্গের মাথা (Glans Penis) ঢেকে রাখা অতিরিক্ত চামড়া বা Foreskin/Prepuce-এর একটি অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা। এই চামড়াটি পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশকে (Glans) ঢেকে রাখে। অনেক বাবা-মা মনে করেন এটি হয়তো একটি সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার বিষয়, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই এটি করানো যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্জারি। ফাইমোসিস (Phimosis) কি ? ফাইমোসিস (Phimosis) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষাঙ্গের সামনের দিকের চামড়াটি অতিরিক্ত টাইট বা সংকুচিত থাকে, যার ফলে চামড়াটি পেছনের দিকে টানা যায় না। শিশুদের জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ঠিক না হলে বা প্রস্রাবে সমস্যা তৈরি করলে তখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ছবিঃ ফাইমোসিস ও প্যারাফিমোসিস লক্ষণ ও উপসর্গ ? খতনা সাধারণত সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিন হিসেবে করা হয়। তবে যদি আপনার শিশুর ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখতে পারেন: খতনা কতটা প্রচলিত? খতনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-প্রধান দেশে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে খতনা শুধু ধর্মীয় প্রথা নয়—এটি একটি সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। তাই কোথায়, কখন এবং কার মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে—এসব বিষয় শিশুর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জনের মাধ্যমে এখন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত ও নিরাপদে শিশুর খতনা করানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই কখন এবং কেন শিশুর খতনা করানো জরুরি। কেন খতনা করা হয়? খতনা করার কারণকে সাধারণভাবে তিন ভাগে দেখা যায়। ১. ধর্মীয় কারণ বাংলাদেশে ছেলে শিশুর খতনার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি। ২. সামাজিক বা ব্যক্তিগত কারণ কিছু পরিবার ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে খতনা করানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৩. চিকিৎসাগত কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণে খতনা প্রয়োজন হতে পারে। যেমন— কোন বয়সে খতনা করা ভালো? এটি অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। খতনার জন্য সবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট “সেরা বয়স” নেই। খতনার উপযুক্ত সময় নির্ভর করে— নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থানীয় অবেদন (Local Anaesthesia) ব্যবহার করে খতনা করা সম্ভব হতে পারে। বড় শিশুর ক্ষেত্রে শিশুর সহযোগিতা, ভয় এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যানেস্থেসিয়ার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই “অমুক বয়সেই খতনা করতেই হবে”—এমন কোনো একক নিয়ম নেই। খতনার আগে শিশুকে কি পরীক্ষা করতে হয়? সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে খতনার আগে চিকিৎসক শিশুকে পরীক্ষা করে দেখবেন— রক্ত পরীক্ষা কি সব শিশুর জন্য দরকার? স্বাভাবিকভাবে সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিনভাবে সব ধরনের রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে শিশুর অতিরিক্ত রক্তপাতের ইতিহাস, রক্তক্ষরণজনিত রোগের পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। তবে ঝুঁকি এড়াতে সাধারণত কিছু রুটিন পরীক্ষা করে নেওয়া উচিৎ। যেমন – রক্ত রোগ হিমোফিলিয়া এবং খতনা? হিমোফিলিয়া এমন একটি রক্ত রোগ যেখানে রক্ত পরা বন্ধ হতে অনেক সময় লাগে। এটি একটি জেনেটিক রোগ যেখানে রক্ত জমাট বাঁধতে যে ফ্যাক্টরগুলো লাগে তার মধ্যে ১টি ফ্যক্টর (ফ্যাক্টর ৮/৯) জন্মগতভাবে অনুপস্থিত অথবা অতিসল্প মাত্রায় থাকে। সাধারণত ছেলে শিশুরাই এই রোগে আক্রান্ত হয়। যদি কোন হিমোফিলিয়া রোগে আক্রান্ত শিশুর খতনা করাতে চায় তাহলে অবশ্যই শিশু সার্জন এবং রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনা করে, তারপর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। হিমোফিলিয়া রোগের চিকিৎসা বেশ ব্যয়বহুল। তাই, খতনা পরবর্তী জটিলতা এবং চিকিৎসা ব্যয়, উভয়ই মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিৎ। কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে খতনা করার আগে বিশেষ সতর্কতা দরকার? কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সরাসরি খতনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে— লিঙ্গের অন্য কোনো জন্মগত অস্বাভাবিকতা থাকলেও আগে শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অস্ত্রোপচারে foreskin-এর চামড়া প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর লিঙ্গের গঠন অস্বাভাবিক মনে হলে আগে শিশু সার্জনকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে তারপর খতনার সিদ্ধান্ত নিন। ছবিঃ হাইপোসপেডিয়াস – সাধারণভাবে খৎনা করা যেখানে উচিৎ নয়। খতনায় কি ধরনের Anesthesia (অবেদন) ব্যবহার করা হয় ? খতনার সময় চিকিৎসক শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের যেকোন একটি anesthesia ব্যবহার করতে পারেন — ছবিঃ Local Anesthesia VS General Anesthesia – দুইটাই নিরাপদ পদ্ধতি। শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা হয় কোনটা বেশি ভাল হবে। খতনার পরে কি ব্যাথা হয় ? হ্যাঁ, ব্যথা হতে পারে, কারণ খতনা একটি অস্ত্রোপচার। তবে যথাযথ ব্যথানিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশুর অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় খতনার সময় কার্যকর ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “বাচ্চা ছোট, তাই ব্যথা বুঝবে না”—এই ধারণা ভুল। শিশুর ব্যথা অনুভূতি আছে এবং খতনার সময় যথাযথ pain relief দেওয়া উচিত। খতনার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জটিলতা কি কি ? যদিও খতনা সাধারণত নিরাপদ একটি ছোট অস্ত্রোপচার, তবুও অন্য যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে- সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এবং যথাযথ ব্যথা নাশক ব্যবহার করে করলে গুরুতর জটিলতা বিরল। ছবিঃ দূর্ভাগ্যজনক কিন্ত বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা। “হাজাম”-নামক বিভীসিকার শিকার কিছু কমলমতি বালক। ভিডিওঃ আপনি যদি অভিভাবক হন তাহলে কাকে দায়ী করবেন এর জন্য? এই শিশুকে, ‘হাজাম’-কে, নাকি নিজেকে? খতনা কীভাবে করা হয় ? খতনার বিভিন্ন surgical technique রয়েছে। পদ্ধতি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং সার্জনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে – খতনার কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো? অভিভাবকরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন— “কোন ডিভাইস/পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো?”বাস্তবে একটি পদ্ধতি সব শিশুর জন্য সেরা নয়। বিভিন্ন বয়স ও পরিস্থিতিতে বিভিন্ন surgical technique বা device ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিশু সার্জন বাচ্চার সকল বিষয় বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিটি নির্বাচন করেন। শুধু “দ্রুত” বা “কম খরচে” হওয়াই ভালো খতনার মাপকাঠি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— প্রশিক্ষিত চিকিৎসক + সঠিক রোগী নির্বাচন + জীবাণুমুক্ত পরিবেশ + যথাযথ ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ + সঠিক ফলো-আপ। অপারেশনের পর শিশুর কি কি স্বাভাবিক লক্ষণ হতে পারে? খতনার পর কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক। যেমন – এসব সাধারণত ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে রক্তপাত বন্ধ না হলে, প্রস্রাব না হলে বা জ্বর/পুঁজ হলে তা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। খতনার পর শিশুর যত্ন কীভাবে করবেন? খতনার পর কতদিনে শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়? সুস্থ হতে শিশুভেদে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। সাধারণভাবে— খতনার পর কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন? নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন— 🚨 রক্তপাত বন্ধ না হওয়া 🚨 বারবার বা বেশি পরিমাণে রক্ত পড়া 🚨 শিশুর প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাব করতে খুব কষ্ট হওয়া 🚨 অতিরিক্ত ফোলা 🚨 পুঁজ

Parents are looking anxiously at the stool of their child because the stool is mixed with fresh blood
Awareness, Specific Disease

শিশুর মলত্যাগের সময় ব্যাথাহীন রক্তপাত: হতে পারে মলাশয়ের পলিপ

শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে আপনি কি করবেন? রেকটাল/মলাশয়ের পলিপ কী? শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে যেকোনো বাবা-মায়ের জন্যই তা চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে নানা রকম ভয়ংকর রোগের চিন্তা উঁকি দিতে থাকে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান এবং একটি সাধারণ কারণ হলো ‘রেকটাল পলিপ’ (Rectal Polyp)। এটি আসলে তেমন ভয় পাওয়ার মতো কোনো রোগ নয়। সহজ কথায়, রেকটাল পলিপ হলো শিশুর মলাশয় বা পায়ুপথের (Rectum) ভেতরের দিকের নরম দেয়ালে ছোট মাংসপিণ্ড বা আঙুরের মতো একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এটি দেখতে অনেকটা ছোট একটি মাশরুমের মতো, যার একটি বোঁটা থাকে এবং বোঁটার মাথায় একটি গোল অংশ থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২ থেকে ১০ বছর বয়সের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, যাকে ‘জুভেনাইল পলিপ’ বলা হয়। মনে রাখা ভালো, শিশুদের এই পলিপগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ নির্দোষ বা বিনাইন (Benign) হয়ে থাকে, অর্থাৎ এগুলো থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। কেন পায়ুপথে এই ধরনের মাংসপিণ্ড তৈরি হয়? শিশুদের মলাশয়ে কেন পলিপ তৈরি হয়, তার সঠিক এবং সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় মলাশয়ের ভেতরের স্তরের (মিউকোসা) কোষগুলো কোনো কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় বিভাজিত হতে শুরু করলে তা ফুলে উঠে এমন মাংসপিণ্ডের আকার ধারণ করে। এছাড়া ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জি, পেটের ভেতরে কোনো ইনফেকশন বা প্রদাহ থাকলে সেখান থেকেও পলিপ তৈরি হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি জেনেটিক বা বংশগত কারণেও হতে পারে; অর্থাৎ পরিবারে যদি আগে কারও পলিপের সমস্যা থেকে থাকে, তবে শিশুরও এটি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি হয় এবং এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাবা-মা কীভাবে বুঝবেন শিশুর পলিপ হয়েছে? রেকটাল পলিপের সবচেয়ে প্রধান এবং দৃশ্যমান লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত তাজা রক্ত পড়া। শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের গায়ে লেগে বা মলের শেষে ফোঁটা ফোঁটা লাল তাজা রক্ত পড়তে দেখা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই রক্ত পড়ার সময় শিশু কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা কান্নাকাটি করে না, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মলদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার (অ্যানাল ফিশার) ব্যথার চেয়ে একদম আলাদা। অনেক সময় পলিপটি যদি মলদ্বারের খুব কাছাকাছি থাকে বা এর বোঁটা অনেক লম্বা হয়, তবে মলত্যাগের সময় যখন শিশু কোঁত দেয়, তখন সেই ছোট গোলাকার লাল বা গাঢ় গোলাপি রঙের মাংসপিণ্ডটি পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। মলত্যাগ শেষ হলে এটি নিজে থেকেই আবার ভেতরে চলে যায় বা অনেক সময় হাত দিয়ে আলতো করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এছাড়া মাঝে মাঝে মলের সাথে মিউকাস বা আমাশয়ের মতো পিচ্ছিল পদার্থও যেতে পারে। ওষুধে কি কাজ হয় নাকি সার্জারি প্রয়োজন? অনেকেই মনে করেন ওষুধ খেলে হয়তো এই মাংসপিণ্ড শুকিয়ে বা ঝরে পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, রেকটাল পলিপের জন্য কোনো কার্যকরী ওষুধ নেই। এর একমাত্র সমাধান হলো একটি ছোট এবং সহজ সার্জারির মাধ্যমে পলিপটি কেটে শরীর থেকে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘পলিপেকটমি’ (Polypectomy)। এই সার্জারিটি অত্যন্ত সহজ এবং নিরাপদ। যদি পলিপটি মলদ্বারের খুব কাছে থাকে, তবে সার্জন পায়ুপথ দিয়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পলিপের বোঁটাটি বেঁধে তা কেটে বের করে আনেন, এর জন্য পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। আর যদি পলিপটি মলাশয়ের একটু ভেতরের দিকে থাকে, তবে ‘কলোনোস্কোপি’ (Colonoscopy) বা এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে একটি ফ্লেক্সিবল টিউব ও ক্যামেরার সাহায্যে ভেতরে গিয়ে পেট না কেটেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপটি অপসারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিশু একেবারেই কোনো ব্যথা পায় না এবং সার্জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে? যদিও শিশুদের রেকটাল পলিপ থেকে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি নেই, তবুও একে অবহেলা করে ফেলে রাখা একেবারেই উচিত নয়। পলিপের গায়ে প্রচুর রক্তনালী থাকে এবং এটি অত্যন্ত নরম হয়। তাই শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের ঘষায় পলিপের গা থেকে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে রক্ত যেতে থাকলে শিশু একসময় মারাত্মক রক্তশূন্যতায় (Anemia) ভুগতে শুরু করে। রক্তশূন্যতার কারণে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে, তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং পড়াশোনা বা খেলাধুলায় সে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া অনেক সময় বড় পলিপ মলাশয়ের পথ আংশিক বন্ধ করে দিয়ে পেটে ব্যথা বা অন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। একবার কাটার পর কি আবার হতে পারে? রেকটাল পলিপ অপসারণ করার পর শিশু খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় এবং রক্ত পড়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যে পলিপটি কেটে ফেলা হয়, সেটি সাধারণত আর ফিরে আসে না। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে জীবনে একবারই এই সমস্যা হয় এবং চিকিৎসা শেষে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের বংশগত প্রবণতা আছে, তাদের ভবিষ্যতে নতুন করে অন্য জায়গায় পলিপ হতে পারে। কেটে ফেলা পলিপটি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার (বায়োপসি) জন্য পাঠানো হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি সম্পূর্ণ নির্দোষ একটি টিউমার মাত্র। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ভয়ের অন্ধকার থেকে আশার আলোতে শিশুর রক্তপাত দেখে যেকোনো বাবা-মায়ের ভয় পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, আতঙ্কিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াবেন না। একটু সাহস করে চিকিৎসকের কাছে যান। আপনার সঠিক সময়ে নেওয়া পদক্ষেপে আপনার শিশু আবার ফিরে পাবে তার আগের সেই প্রাণবন্ত হাসি এবং সুস্থ জীবন। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত উপায়ে শিশুর পায়ুপথ পরীক্ষা করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে রক্তপাতের কারণটি কেবল পলিপ, অন্য কোনো জটিল রোগ নয়। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপ অপসারণের মাধ্যমে তিনি শিশুর রক্তপাত চিরতরে বন্ধ করেন এবং উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের মনে স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে আনেন।

Pediatric Surgeron Dr. Prosenjit Datta examining a patient clinically in his chamber and the parents are anxiously observing him
Awareness

হঠাৎ শিশুর পেটের ব্যাথা সাথে বমি বমি ভাবঃ অ্যাপেন্ডিসাইটিস?

শিশুদের খুবই কমন একটি সমস্যা যা অনেক সময় শিশুদের অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায় বাবা-মায়ের শুধু একটু সচেনতনতার অভাবে অ্যাপেন্ডিসাইটিস আসলে কী? শিশুদের পেট ব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। অতিরিক্ত খাওয়া, গ্যাস বা বদহজমের কারণে প্রায়ই শিশুরা পেট ব্যথার অভিযোগ করে। কিন্তু সব পেট ব্যথা সাধারণ নয়। শিশুর পেট ব্যথা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং তা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তবে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে, যা একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা। মানুষের পেটের ডান দিকের নিচের অংশে বৃহদান্ত্রের (বড় নাড়িভুঁড়ি) সাথে যুক্ত আঙুলের মতো ছোট একটি নালি থাকে, যাকে ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ বলা হয়। মানবদেহে এর তেমন কোনো বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই ছোট নালিটিতে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর সংক্রমণ হয় এবং এটি ফুলে ওঠে ও প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তখন সেই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থাকেই বলা হয় অ্যাপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis)। এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কেন শিশুদের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়? অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার মূল কারণ হলো অ্যাপেন্ডিক্সের সরু নালিপথটি কোনো কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পথ বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শক্ত মলের টুকরো বা পাথর (Fecolith) গিয়ে নালির মুখটি আটকে দেওয়া। এছাড়া অনেক সময় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরের গ্রন্থিগুলো ফুলে গিয়েও এই পথটি বন্ধ করে দিতে পারে। কখনো কখনো কৃমি বা অপাচ্য ফলের বিচিও এর জন্য দায়ী হতে পারে। একবার যখন নালির মুখটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে। এর ফলে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতর পুঁজ জমতে থাকে, এটি ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায় এবং ভেতরে প্রচুর চাপ তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণেই প্রচণ্ড ব্যথার সৃষ্টি হয়। সাধারণ পেট ব্যথা আর অ্যাপেন্ডিসাইটিসের পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে? অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণগুলো খুবই নির্দিষ্ট এবং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নিয়মে প্রকাশ পায়। শুরুতে শিশুর ব্যথাটা সাধারণত নাভির চারপাশে হালকাভাবে শুরু হয়। শিশু হয়তো বলতে পারে না ঠিক কোথায় ব্যথা করছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার সাথে সাথে এই ব্যথা ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে (Right iliac fossa) গিয়ে স্থির হয় এবং ব্যথার তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে চায়। হাঁটাচলা করলে, জোরে শ্বাস নিলে বা কাশলে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। পেট ব্যথার পাশাপাশি শিশুর বমি ভাব বা বারবার বমি হতে পারে। খাবারে সম্পূর্ণ অরুচি দেখা দেয় এবং হালকা জ্বর (সাধারণত ১০০-১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) থাকে। আপনি যদি পেটের ডান দিকের নিচের অংশে আলতো করে চাপ দেন, শিশু ব্যথায় চিৎকার করে উঠতে পারে। এমনকি চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো বিকল্প চিকিৎসা আছে? অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিশ্চিত হলে এর একমাত্র এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হলো অপারেশন বা সার্জারির মাধ্যমে ফুলে যাওয়া এবং ইনফেকশনযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্সটি শরীর থেকে কেটে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘অ্যাপেন্ডিসেকটমি’ (Appendectomy)। ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো ব্যথা কমানো যায়, কিন্তু এতে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি করা উচিত। বর্তমানে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সার্জারিটি প্রধানত অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক (Laparoscopic) পদ্ধতিতে করা হয়। এই পদ্ধতিতে পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। পেটে ছোট ছোট তিনটি ফুটো করে ক্যামেরা এবং বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে বের করে আনা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা হলো এতে শিশুর কষ্ট কম হয়, পেটে বড় কোনো দাগ থাকে না এবং শিশু মাত্র এক বা দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে। তবে অবস্থা খুব জটিল হলে সার্জন ওপেন সার্জারি বা পেট কেটে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসা না করালে বা দেরি করলে কী হতে পারে? অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে সময়ই হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। লক্ষণ শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক চিকিৎসা না হলে ফুলে থাকা অ্যাপেন্ডিক্সটি অতিরিক্ত চাপে ফেটে যেতে পারে (Ruptured Appendix)। এটি একটি অত্যন্ত ভয়ংকর পরিস্থিতি। অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেলে ভেতরের সমস্ত পুঁজ, মল এবং জীবাণু পুরো পেটের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পুরো পেটে মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়, যাকে ‘পেরিটোনাইটিস’ (Peritonitis) বলে। তখন শিশুর সারা পেট ফুলে যায়, প্রচণ্ড জ্বর আসে, বারবার বমি হয় এবং রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে শিশুর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় সার্জারি করা অনেক জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং শিশুকে দীর্ঘ সময় আইসিইউ বা হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। অ্যাপেন্ডিক্স ছাড়া শিশু কি সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে? অনেক বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন থাকে, অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেললে ভবিষ্যতে শিশুর কোনো সমস্যা হবে কি না। এর উত্তর হলো—একেবারেই না। আগেই বলা হয়েছে, মানবদেহে অ্যাপেন্ডিক্সের কোনো অপরিহার্য কাজ নেই। এটি কেটে ফেলে দিলে শিশুর হজমশক্তি, শারীরিক বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। সফল অপারেশনের পর শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার ভয় থাকে না। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: অবহেলা নয়, প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা শিশুর পেট ব্যথাকে কখনোই সাধারণ গ্যাস বা বদহজম ভেবে অবহেলা করবেন না বা নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ খাইয়ে ব্যথা কমিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না। ব্যথার ওষুধ আসল রোগকে লুকিয়ে রাখে, যা পরে ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। আপনার দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে আপনার অমূল্য রতনকে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা শিশুদের পেট ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। একজন দক্ষ পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শিশুর লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করেন। এরপর অত্যাধুনিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি শিশুর দ্রুত ও নিরাপদ আরোগ্য নিশ্চিত করেন, যাতে আপনার সন্তান আবার তার প্রাণবন্ত হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে তুলতে পারে।

Pediatric Surgeron Dr. Prosenjit Datta counseling the gurdians of a 2 years old boy who have recently been diagnosed with undescended testes
Awareness, Parenting

শিশুর অণ্ডকোষ যথাস্থানে না থাকা – Undescended Testes

ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে কেন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন? আনডিসেনডেড টেস্টিস বা ক্রিপটোরকিডিজম কী? মা-বাবার কাছে নবজাতক শিশুর আগমন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। জন্মের পর চিকিৎসকরা যখন শিশুর সম্পূর্ণ শরীর পরীক্ষা করেন, তখন ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো অণ্ডকোষ বা টেস্টিস ঠিক জায়গায় আছে কি না তা দেখা। আনডিসেনডেড টেস্টিস (Undescended Testes) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ তার নির্দিষ্ট থলিতে (স্ক্রোটামে) নেমে আসে না। সহজ কথায়, অণ্ডকোষের থলিটি খালি বা অপূর্ণ থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ক্রিপটোরকিডিজম (Cryptorchidism) বলা হয়, যার অর্থ ‘লুকানো অণ্ডকোষ’। এটি সাধারণত অপরিণত বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেওয়া (প্রিম্যাচিউর) শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তবে স্বাভাবিক সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও এই সমস্যা হতে পারে। এটি এমন একটি সমস্যা যা বাইরে থেকে দেখে ভয়ানক কিছু মনে না হলেও শিশুর ভবিষ্যতের জন্য এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। কেন অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না? এই সমস্যাটি বোঝার জন্য আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে, যখন শিশু মায়ের গর্ভে ছিল। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে, কিডনির ঠিক নিচেই তৈরি হতে শুরু করে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে (সাধারণত অষ্টম বা নবম মাসে) পেটের ভেতরের হরমোনের প্রভাবে এই অণ্ডকোষগুলো একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে জমা হয়। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জিনগত ত্রুটি, মায়ের গর্ভাবস্থায় সঠিক হরমোনের অভাব, বা অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পথে শারীরিক কোনো বাধা থাকলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি মাঝপথেই থেমে যায়। ফলে অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে বা কুঁচকির কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় আটকে থাকে, থলি পর্যন্ত আর পৌঁছাতে পারে না। বাবা-মা কীভাবে এই সমস্যাটি ধরতে পারবেন? আনডিসেনডেড টেস্টিসের সবচেয়ে প্রধান এবং একমাত্র লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি খালি অনুভব হওয়া। বাবা-মা যখন শিশুকে গোসল করান বা কাপড় পরান, তখন তারা খেয়াল করতে পারেন যে শিশুর অণ্ডকোষের থলির এক পাশ বা উভয় পাশ স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট বা চুপসানো দেখাচ্ছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করলে থলির ভেতরে শক্ত গোলাকার অণ্ডকোষটি খুঁজে পাওয়া যায় না। শিশু এতে কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা তার প্রস্রাবেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে মাঝে মাঝে অণ্ডকোষটি কুঁচকির কাছে ফুলে থাকতে দেখা যেতে পারে। অনেক সময় শিশুর অণ্ডকোষ একবার নিচে নামে আবার উপরে উঠে যায়, যাকে ‘রিট্রাকটাইল টেস্টিস’ বলে। এটি একটি ভিন্ন অবস্থা যা সাধারণত সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আনডিসেনডেড টেস্টিস কখনোই থলিতে থাকে না। এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষাই যথেষ্ট। চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো ওষুধের চিকিৎসা আছে? আনডিসেনডেড টেস্টিসের চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত চিকিৎসকরা সাধারণত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন, কারণ এই সময়ের মধ্যে হরমোনের প্রভাবে আটকে থাকা অণ্ডকোষ নিজে থেকেই নিচে নেমে আসতে পারে। কিন্তু শিশুর বয়স ছয় মাস পার হয়ে গেলে আর অপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ এরপর প্রাকৃতিকভাবে অণ্ডকোষ নিচে নামার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর জন্য কোনো ওষুধ বা হরমোন ইনজেকশন কার্যকর নয়। একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা হলো সার্জারি, যাকে ‘অরকিডোপেক্সি’ (Orchidopexy) বলা হয়। এই অপারেশন সাধারণত শিশুর ৬ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যেই করে ফেলা সবচেয়ে ভালো। সার্জারিতে সার্জন কুঁচকির কাছে ছোট একটি অংশ কেটে আটকে থাকা অণ্ডকোষটি খুঁজে বের করেন এবং সেটিকে সতর্কতার সাথে নিচে নামিয়ে থলির ভেতর সুতোর সাহায্যে আটকে দেন। যদি অণ্ডকোষটি পেটের অনেক গভীরে থাকে এবং বাইরে থেকে স্পর্শ করে বোঝা না যায়, তবে অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির (ক্যামেরা দিয়ে পেটের ভেতর দেখা) মাধ্যমে সেটিকে খুঁজে বের করে নিচে নামিয়ে আনা হয়। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের মারাত্মক জটিলতা হতে পারে? এই সমস্যাটি যদি সময়মতো অপারেশন করে ঠিক করা না হয়, তবে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে দুটি মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রথমত, বন্ধ্যত্ব (Infertility)। অণ্ডকোষের প্রধান কাজ হলো শুক্রাণু বা স্পার্ম তৈরি করা। শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, যে কারণেই প্রকৃতি অণ্ডকোষকে শরীরের বাইরে থলিতে রেখেছে। পেটের ভেতরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই অণ্ডকোষ দীর্ঘদিন পেটের ভেতরে থাকলে অতিরিক্ত গরমে সেটি নষ্ট হয়ে যায় এবং শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে, ফলে শিশু ভবিষ্যতে বাবা হওয়ার সক্ষমতা হারায়। দ্বিতীয়ত, টেস্টিকুলার ক্যান্সার (Testicular Cancer)। যে অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না, ভবিষ্যতে সেই অণ্ডকোষে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে। সময়মতো সার্জারি করলে এই ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। শিশুর বেড়ে ওঠা কেমন হবে? সঠিক সময়ে এবং সঠিক বয়সে (৬ থেকে ১৮ মাস) আনডিসেনডেড টেস্টিসের অপারেশন সম্পন্ন হলে শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। অপারেশন করা অণ্ডকোষটি থলির ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে থাকে এবং শিশুর প্রজনন ক্ষমতা বা বাবা হওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। অপারেশনের পর শিশু খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শিশুদের মতোই সব ধরনের শারীরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: সচেতনতাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে। আজই গোসলের সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় আপনার শিশুর শারীরিক বিকাশ খেয়াল করুন। অণ্ডকোষের থলি খালি মনে হলে দেরি না করে দ্রুত পেডিয়াট্রিক সার্জনের শরণাপন্ন হোন। লোকলজ্জা বা ভয়ে চুপ করে থাকা আপনার সন্তানের সারাজীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা আনডিসেনডেড টেস্টিসের সার্জারি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল অপারেশন। অণ্ডকোষের সাথে যুক্ত রক্তনালী এবং শুক্রাণু চলাচলের নালীগুলো অত্যন্ত সরু থাকে। একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জন তাঁর বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং নিখুঁত হাতের জাদুতে এই রক্তনালীগুলোকে অক্ষত রেখে অণ্ডকোষকে সঠিক জায়গায় স্থাপন করেন, যা আপনার সন্তানের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

Awareness

শিশুর অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া বা হাইড্রোসিল

কারণ, লক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসার বিস্তারিত গাইডলাইন হাইড্রোসিল বলতে কী বোঝায়? ছোট্ট ছেলে শিশুর বাবা-মায়েদের কাছে একটি খুব পরিচিত এবং চিন্তার বিষয় হলো শিশুর অণ্ডকোষের থলি বা স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া। অনেক সময় জন্মের পরপরই বা কয়েক মাস পরে বাবা-মা গোসল করানোর সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় খেয়াল করেন যে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ অস্বাভাবিকভাবে বড় দেখাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইড্রোসিল। গ্রিক শব্দ ‘হাইড্রো’ মানে পানি বা তরল এবং ‘সিল’ মানে থলি। অর্থাৎ, হাইড্রোসিল মানে হলো অণ্ডকোষের চারপাশের থলিতে তরল বা পানি জমে ফুলে যাওয়া। এটি দেখতে অনেকটা পানিভর্তি ছোট বেলুনের মতো মনে হতে পারে। এটি শুনলে যতটা ভয়ের মনে হয়, আসলে এটি ততটা বিপজ্জনক নয়। এটি একটি সাধারণ সমস্যা এবং এর অত্যন্ত কার্যকরী ও নিরাপদ চিকিৎসা রয়েছে। এটি কোনো ইনফেকশন বা ক্যান্সারের লক্ষণ নয়, তাই বাবা-মায়েদের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেন অণ্ডকোষে পানি জমে? হাইড্রোসিল হওয়ার পেছনের মূল কারণটি শিশুর মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সময়ের সাথে সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের ওপরের অংশে তৈরি হয়। জন্মের কাছাকাছি সময়ে এই অণ্ডকোষগুলো একটি ছোট সুড়ঙ্গ বা নালিপথ দিয়ে পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নেমে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে এসে অবস্থান নেয়। এই পথটি দিয়ে নিচে নামার সময় অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের একটি পাতলা পর্দার আবরণ সাথে করে নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পর এই সুড়ঙ্গপথটি নিজে থেকেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং অণ্ডকোষের চারপাশের তরল শরীর শুষে নেয়। কিন্তু অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এই সুড়ঙ্গপথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয় না। ফলে পেটের ভেতরের তরল বা পানি সেই খোলা পথ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে নিচে নেমে এসে অণ্ডকোষের চারপাশে জমতে থাকে। এই জমে থাকা পানির কারণেই অণ্ডকোষ ফুলে যায় এবং হাইড্রোসিলের সৃষ্টি হয়। একে ‘কমিউনিকেটিং হাইড্রোসিল’ বলা হয়। হাইড্রোসিল হলে শিশু কেমন আচরণ করে? হাইড্রোসিলের সবচেয়ে প্রধান এবং স্পষ্ট লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি ফুলে যাওয়া। এই ফোলাভাব ডান দিকে, বাম দিকে অথবা উভয় দিকেই হতে পারে। সাধারণত এই ফোলা অংশে শিশুর কোনো ব্যথা থাকে না। আপনি যদি ফোলা অংশটি আলতো করে স্পর্শ করেন, তবে সেটি নরম এবং মসৃণ মনে হবে, ঠিক যেন পানিভর্তি একটি থলি। মজার ব্যাপার হলো, এই ফোলাভাব সারাদিন এক রকম থাকে না। শিশু যখন রাতে ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয়, তখন পেটের ভেতরের পানি আবার পেটে ফিরে যায় বলে সকালে ফোলাভাব কম থাকে। কিন্তু সারাদিন খেলাধুলা করলে, কাঁদলে বা হাঁটাচলা করলে বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফোলাভাব অনেক বেড়ে যায়। হাইড্রোসিলের কারণে শিশুর প্রস্রাব করতে কোনো সমস্যা হয় না বা সাধারণত তার জ্বরও আসে না। তবে ফোলা অংশটি অনেক বড় হয়ে গেলে শিশুর চলাফেরা করতে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। কখন এবং কীভাবে এর সমাধান করা হয়? হাইড্রোসিলের চিকিৎসায় সময়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে জন্মের পর প্রথম এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই ডাক্তাররা সাধারণত প্রথম এক-দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। এই সময়ে কোনো ওষুধ বা মালিশের প্রয়োজন নেই, কারণ ওষুধ দিয়ে এই পানি শুকানো সম্ভব নয়। কিন্তু শিশুর বয়স দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি হাইড্রোসিল না কমে, অথবা ফোলা অংশটি যদি প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে, তবে সার্জারি বা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সার্জারিটি খুবই সহজ এবং নিরাপদ। পেডিয়াট্রিক সার্জন কুঁচকির কাছে অত্যন্ত ছোট একটি অংশ কেটে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি (যেটি দিয়ে পানি আসছিল) সেলাই করে পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর ফলে পেটের তরল আর নিচে নামতে পারে না। আজকাল ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতেও অত্যন্ত সফলভাবে এবং কম সময়ে এই সার্জারি করা সম্ভব। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে? যদিও হাইড্রোসিল সাধারণত ব্যথামুক্ত থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন এটি চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, যে সুড়ঙ্গ দিয়ে পানি নিচে নামছে, সেটি যদি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে, তবে সেখান দিয়ে পেটের নাড়িভুঁড়িও নিচে নেমে আসতে পারে। তখন এটি ইনগুইনাল হার্নিয়াতে রূপান্তরিত হয়, যা একটি জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। এছাড়া, অণ্ডকোষের চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে থাকলে সেই পানির চাপে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে শিশুর অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে তার প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হাইড্রোসিলের অপারেশনের পর শিশুর সুস্থ হওয়ার হার প্রায় শতভাগ। এটি একটি ‘ডে-কেয়ার’ সার্জারি, অর্থাৎ শিশু সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপারেশন শেষে ওই দিনই বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। অপারেশনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই শিশু তার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসে। এই সার্জারির কারণে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো প্রভাব পড়ে না, বরং এটি তার অণ্ডকোষের সুস্থ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। পুনরায় হাইড্রোসিল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই বিরল। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ধৈর্য এবং সঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত শিশুর শরীরের যেকোনো পরিবর্তন বাবা-মায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে হাইড্রোসিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান। কুসংস্কার বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে সঠিক সময়ে পেডিয়াট্রিক সার্জনের কাছে যান। আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানকে একটি সুস্থ জীবন উপহার দিতে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন কেবল সার্জারিই করেন না, তিনি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং হাইড্রোসিলের ধরন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন। কখন অপেক্ষা করতে হবে আর কখন সার্জারি করতে হবে—এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রহণ করে তিনি আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করেন।

Scroll to Top