Dr. Prosenjit Datta

শিশুর অণ্ডকোষ যথাস্থানে না থাকা – Undescended Testes

ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে কেন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন?

আনডিসেনডেড টেস্টিস বা ক্রিপটোরকিডিজম কী?

মা-বাবার কাছে নবজাতক শিশুর আগমন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। জন্মের পর চিকিৎসকরা যখন শিশুর সম্পূর্ণ শরীর পরীক্ষা করেন, তখন ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো অণ্ডকোষ বা টেস্টিস ঠিক জায়গায় আছে কি না তা দেখা। আনডিসেনডেড টেস্টিস (Undescended Testes) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ তার নির্দিষ্ট থলিতে (স্ক্রোটামে) নেমে আসে না। সহজ কথায়, অণ্ডকোষের থলিটি খালি বা অপূর্ণ থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ক্রিপটোরকিডিজম (Cryptorchidism) বলা হয়, যার অর্থ ‘লুকানো অণ্ডকোষ’। এটি সাধারণত অপরিণত বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেওয়া (প্রিম্যাচিউর) শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তবে স্বাভাবিক সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও এই সমস্যা হতে পারে। এটি এমন একটি সমস্যা যা বাইরে থেকে দেখে ভয়ানক কিছু মনে না হলেও শিশুর ভবিষ্যতের জন্য এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।

কেন অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না?

এই সমস্যাটি বোঝার জন্য আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে, যখন শিশু মায়ের গর্ভে ছিল। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে, কিডনির ঠিক নিচেই তৈরি হতে শুরু করে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে (সাধারণত অষ্টম বা নবম মাসে) পেটের ভেতরের হরমোনের প্রভাবে এই অণ্ডকোষগুলো একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে জমা হয়। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জিনগত ত্রুটি, মায়ের গর্ভাবস্থায় সঠিক হরমোনের অভাব, বা অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পথে শারীরিক কোনো বাধা থাকলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি মাঝপথেই থেমে যায়। ফলে অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে বা কুঁচকির কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় আটকে থাকে, থলি পর্যন্ত আর পৌঁছাতে পারে না।

বাবা-মা কীভাবে এই সমস্যাটি ধরতে পারবেন?

আনডিসেনডেড টেস্টিসের সবচেয়ে প্রধান এবং একমাত্র লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি খালি অনুভব হওয়া। বাবা-মা যখন শিশুকে গোসল করান বা কাপড় পরান, তখন তারা খেয়াল করতে পারেন যে শিশুর অণ্ডকোষের থলির এক পাশ বা উভয় পাশ স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট বা চুপসানো দেখাচ্ছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করলে থলির ভেতরে শক্ত গোলাকার অণ্ডকোষটি খুঁজে পাওয়া যায় না। শিশু এতে কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা তার প্রস্রাবেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে মাঝে মাঝে অণ্ডকোষটি কুঁচকির কাছে ফুলে থাকতে দেখা যেতে পারে। অনেক সময় শিশুর অণ্ডকোষ একবার নিচে নামে আবার উপরে উঠে যায়, যাকে ‘রিট্রাকটাইল টেস্টিস’ বলে। এটি একটি ভিন্ন অবস্থা যা সাধারণত সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আনডিসেনডেড টেস্টিস কখনোই থলিতে থাকে না। এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষাই যথেষ্ট।

চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো ওষুধের চিকিৎসা আছে?

আনডিসেনডেড টেস্টিসের চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত চিকিৎসকরা সাধারণত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন, কারণ এই সময়ের মধ্যে হরমোনের প্রভাবে আটকে থাকা অণ্ডকোষ নিজে থেকেই নিচে নেমে আসতে পারে। কিন্তু শিশুর বয়স ছয় মাস পার হয়ে গেলে আর অপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ এরপর প্রাকৃতিকভাবে অণ্ডকোষ নিচে নামার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর জন্য কোনো ওষুধ বা হরমোন ইনজেকশন কার্যকর নয়। একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা হলো সার্জারি, যাকে ‘অরকিডোপেক্সি’ (Orchidopexy) বলা হয়। এই অপারেশন সাধারণত শিশুর ৬ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যেই করে ফেলা সবচেয়ে ভালো। সার্জারিতে সার্জন কুঁচকির কাছে ছোট একটি অংশ কেটে আটকে থাকা অণ্ডকোষটি খুঁজে বের করেন এবং সেটিকে সতর্কতার সাথে নিচে নামিয়ে থলির ভেতর সুতোর সাহায্যে আটকে দেন। যদি অণ্ডকোষটি পেটের অনেক গভীরে থাকে এবং বাইরে থেকে স্পর্শ করে বোঝা না যায়, তবে অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির (ক্যামেরা দিয়ে পেটের ভেতর দেখা) মাধ্যমে সেটিকে খুঁজে বের করে নিচে নামিয়ে আনা হয়।

চিকিৎসা না করালে কী ধরনের মারাত্মক জটিলতা হতে পারে?

এই সমস্যাটি যদি সময়মতো অপারেশন করে ঠিক করা না হয়, তবে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে দুটি মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রথমত, বন্ধ্যত্ব (Infertility)। অণ্ডকোষের প্রধান কাজ হলো শুক্রাণু বা স্পার্ম তৈরি করা। শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, যে কারণেই প্রকৃতি অণ্ডকোষকে শরীরের বাইরে থলিতে রেখেছে। পেটের ভেতরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই অণ্ডকোষ দীর্ঘদিন পেটের ভেতরে থাকলে অতিরিক্ত গরমে সেটি নষ্ট হয়ে যায় এবং শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে, ফলে শিশু ভবিষ্যতে বাবা হওয়ার সক্ষমতা হারায়। দ্বিতীয়ত, টেস্টিকুলার ক্যান্সার (Testicular Cancer)। যে অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না, ভবিষ্যতে সেই অণ্ডকোষে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে। সময়মতো সার্জারি করলে এই ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব।

শিশুর বেড়ে ওঠা কেমন হবে?

সঠিক সময়ে এবং সঠিক বয়সে (৬ থেকে ১৮ মাস) আনডিসেনডেড টেস্টিসের অপারেশন সম্পন্ন হলে শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। অপারেশন করা অণ্ডকোষটি থলির ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে থাকে এবং শিশুর প্রজনন ক্ষমতা বা বাবা হওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। অপারেশনের পর শিশু খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শিশুদের মতোই সব ধরনের শারীরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে।

পিতামাতার জন্য শিক্ষা: সচেতনতাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি

আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে। আজই গোসলের সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় আপনার শিশুর শারীরিক বিকাশ খেয়াল করুন। অণ্ডকোষের থলি খালি মনে হলে দেরি না করে দ্রুত পেডিয়াট্রিক সার্জনের শরণাপন্ন হোন। লোকলজ্জা বা ভয়ে চুপ করে থাকা আপনার সন্তানের সারাজীবনের কান্নার কারণ হতে পারে।

পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা

আনডিসেনডেড টেস্টিসের সার্জারি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল অপারেশন। অণ্ডকোষের সাথে যুক্ত রক্তনালী এবং শুক্রাণু চলাচলের নালীগুলো অত্যন্ত সরু থাকে। একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জন তাঁর বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং নিখুঁত হাতের জাদুতে এই রক্তনালীগুলোকে অক্ষত রেখে অণ্ডকোষকে সঠিক জায়গায় স্থাপন করেন, যা আপনার সন্তানের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top