Dr. Prosenjit Datta

July 21, 2026

Parents are looking anxiously at the stool of their child because the stool is mixed with fresh blood
Awareness, Specific Disease

শিশুর মলত্যাগের সময় ব্যাথাহীন রক্তপাত: হতে পারে মলাশয়ের পলিপ

শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে আপনি কি করবেন? রেকটাল/মলাশয়ের পলিপ কী? শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে যেকোনো বাবা-মায়ের জন্যই তা চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে নানা রকম ভয়ংকর রোগের চিন্তা উঁকি দিতে থাকে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান এবং একটি সাধারণ কারণ হলো ‘রেকটাল পলিপ’ (Rectal Polyp)। এটি আসলে তেমন ভয় পাওয়ার মতো কোনো রোগ নয়। সহজ কথায়, রেকটাল পলিপ হলো শিশুর মলাশয় বা পায়ুপথের (Rectum) ভেতরের দিকের নরম দেয়ালে ছোট মাংসপিণ্ড বা আঙুরের মতো একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এটি দেখতে অনেকটা ছোট একটি মাশরুমের মতো, যার একটি বোঁটা থাকে এবং বোঁটার মাথায় একটি গোল অংশ থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২ থেকে ১০ বছর বয়সের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, যাকে ‘জুভেনাইল পলিপ’ বলা হয়। মনে রাখা ভালো, শিশুদের এই পলিপগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ নির্দোষ বা বিনাইন (Benign) হয়ে থাকে, অর্থাৎ এগুলো থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে। কেন পায়ুপথে এই ধরনের মাংসপিণ্ড তৈরি হয়? শিশুদের মলাশয়ে কেন পলিপ তৈরি হয়, তার সঠিক এবং সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় মলাশয়ের ভেতরের স্তরের (মিউকোসা) কোষগুলো কোনো কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় বিভাজিত হতে শুরু করলে তা ফুলে উঠে এমন মাংসপিণ্ডের আকার ধারণ করে। এছাড়া ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জি, পেটের ভেতরে কোনো ইনফেকশন বা প্রদাহ থাকলে সেখান থেকেও পলিপ তৈরি হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি জেনেটিক বা বংশগত কারণেও হতে পারে; অর্থাৎ পরিবারে যদি আগে কারও পলিপের সমস্যা থেকে থাকে, তবে শিশুরও এটি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি হয় এবং এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না। বাবা-মা কীভাবে বুঝবেন শিশুর পলিপ হয়েছে? রেকটাল পলিপের সবচেয়ে প্রধান এবং দৃশ্যমান লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত তাজা রক্ত পড়া। শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের গায়ে লেগে বা মলের শেষে ফোঁটা ফোঁটা লাল তাজা রক্ত পড়তে দেখা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই রক্ত পড়ার সময় শিশু কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা কান্নাকাটি করে না, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মলদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার (অ্যানাল ফিশার) ব্যথার চেয়ে একদম আলাদা। অনেক সময় পলিপটি যদি মলদ্বারের খুব কাছাকাছি থাকে বা এর বোঁটা অনেক লম্বা হয়, তবে মলত্যাগের সময় যখন শিশু কোঁত দেয়, তখন সেই ছোট গোলাকার লাল বা গাঢ় গোলাপি রঙের মাংসপিণ্ডটি পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। মলত্যাগ শেষ হলে এটি নিজে থেকেই আবার ভেতরে চলে যায় বা অনেক সময় হাত দিয়ে আলতো করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এছাড়া মাঝে মাঝে মলের সাথে মিউকাস বা আমাশয়ের মতো পিচ্ছিল পদার্থও যেতে পারে। ওষুধে কি কাজ হয় নাকি সার্জারি প্রয়োজন? অনেকেই মনে করেন ওষুধ খেলে হয়তো এই মাংসপিণ্ড শুকিয়ে বা ঝরে পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, রেকটাল পলিপের জন্য কোনো কার্যকরী ওষুধ নেই। এর একমাত্র সমাধান হলো একটি ছোট এবং সহজ সার্জারির মাধ্যমে পলিপটি কেটে শরীর থেকে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘পলিপেকটমি’ (Polypectomy)। এই সার্জারিটি অত্যন্ত সহজ এবং নিরাপদ। যদি পলিপটি মলদ্বারের খুব কাছে থাকে, তবে সার্জন পায়ুপথ দিয়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পলিপের বোঁটাটি বেঁধে তা কেটে বের করে আনেন, এর জন্য পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। আর যদি পলিপটি মলাশয়ের একটু ভেতরের দিকে থাকে, তবে ‘কলোনোস্কোপি’ (Colonoscopy) বা এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে একটি ফ্লেক্সিবল টিউব ও ক্যামেরার সাহায্যে ভেতরে গিয়ে পেট না কেটেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপটি অপসারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিশু একেবারেই কোনো ব্যথা পায় না এবং সার্জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে? যদিও শিশুদের রেকটাল পলিপ থেকে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি নেই, তবুও একে অবহেলা করে ফেলে রাখা একেবারেই উচিত নয়। পলিপের গায়ে প্রচুর রক্তনালী থাকে এবং এটি অত্যন্ত নরম হয়। তাই শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের ঘষায় পলিপের গা থেকে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে রক্ত যেতে থাকলে শিশু একসময় মারাত্মক রক্তশূন্যতায় (Anemia) ভুগতে শুরু করে। রক্তশূন্যতার কারণে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে, তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং পড়াশোনা বা খেলাধুলায় সে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া অনেক সময় বড় পলিপ মলাশয়ের পথ আংশিক বন্ধ করে দিয়ে পেটে ব্যথা বা অন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। একবার কাটার পর কি আবার হতে পারে? রেকটাল পলিপ অপসারণ করার পর শিশু খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় এবং রক্ত পড়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যে পলিপটি কেটে ফেলা হয়, সেটি সাধারণত আর ফিরে আসে না। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে জীবনে একবারই এই সমস্যা হয় এবং চিকিৎসা শেষে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের বংশগত প্রবণতা আছে, তাদের ভবিষ্যতে নতুন করে অন্য জায়গায় পলিপ হতে পারে। কেটে ফেলা পলিপটি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার (বায়োপসি) জন্য পাঠানো হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি সম্পূর্ণ নির্দোষ একটি টিউমার মাত্র। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ভয়ের অন্ধকার থেকে আশার আলোতে শিশুর রক্তপাত দেখে যেকোনো বাবা-মায়ের ভয় পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, আতঙ্কিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াবেন না। একটু সাহস করে চিকিৎসকের কাছে যান। আপনার সঠিক সময়ে নেওয়া পদক্ষেপে আপনার শিশু আবার ফিরে পাবে তার আগের সেই প্রাণবন্ত হাসি এবং সুস্থ জীবন। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত উপায়ে শিশুর পায়ুপথ পরীক্ষা করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে রক্তপাতের কারণটি কেবল পলিপ, অন্য কোনো জটিল রোগ নয়। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপ অপসারণের মাধ্যমে তিনি শিশুর রক্তপাত চিরতরে বন্ধ করেন এবং উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের মনে স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে আনেন।

Pediatric Surgeron Dr. Prosenjit Datta examining a patient clinically in his chamber and the parents are anxiously observing him
Awareness

হঠাৎ শিশুর পেটের ব্যাথা সাথে বমি বমি ভাবঃ অ্যাপেন্ডিসাইটিস?

শিশুদের খুবই কমন একটি সমস্যা যা অনেক সময় শিশুদের অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায় বাবা-মায়ের শুধু একটু সচেনতনতার অভাবে অ্যাপেন্ডিসাইটিস আসলে কী? শিশুদের পেট ব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। অতিরিক্ত খাওয়া, গ্যাস বা বদহজমের কারণে প্রায়ই শিশুরা পেট ব্যথার অভিযোগ করে। কিন্তু সব পেট ব্যথা সাধারণ নয়। শিশুর পেট ব্যথা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং তা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তবে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে, যা একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা। মানুষের পেটের ডান দিকের নিচের অংশে বৃহদান্ত্রের (বড় নাড়িভুঁড়ি) সাথে যুক্ত আঙুলের মতো ছোট একটি নালি থাকে, যাকে ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ বলা হয়। মানবদেহে এর তেমন কোনো বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই ছোট নালিটিতে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর সংক্রমণ হয় এবং এটি ফুলে ওঠে ও প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তখন সেই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থাকেই বলা হয় অ্যাপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis)। এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কেন শিশুদের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়? অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার মূল কারণ হলো অ্যাপেন্ডিক্সের সরু নালিপথটি কোনো কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পথ বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শক্ত মলের টুকরো বা পাথর (Fecolith) গিয়ে নালির মুখটি আটকে দেওয়া। এছাড়া অনেক সময় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরের গ্রন্থিগুলো ফুলে গিয়েও এই পথটি বন্ধ করে দিতে পারে। কখনো কখনো কৃমি বা অপাচ্য ফলের বিচিও এর জন্য দায়ী হতে পারে। একবার যখন নালির মুখটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে। এর ফলে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতর পুঁজ জমতে থাকে, এটি ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায় এবং ভেতরে প্রচুর চাপ তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণেই প্রচণ্ড ব্যথার সৃষ্টি হয়। সাধারণ পেট ব্যথা আর অ্যাপেন্ডিসাইটিসের পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে? অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণগুলো খুবই নির্দিষ্ট এবং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নিয়মে প্রকাশ পায়। শুরুতে শিশুর ব্যথাটা সাধারণত নাভির চারপাশে হালকাভাবে শুরু হয়। শিশু হয়তো বলতে পারে না ঠিক কোথায় ব্যথা করছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার সাথে সাথে এই ব্যথা ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে (Right iliac fossa) গিয়ে স্থির হয় এবং ব্যথার তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে চায়। হাঁটাচলা করলে, জোরে শ্বাস নিলে বা কাশলে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। পেট ব্যথার পাশাপাশি শিশুর বমি ভাব বা বারবার বমি হতে পারে। খাবারে সম্পূর্ণ অরুচি দেখা দেয় এবং হালকা জ্বর (সাধারণত ১০০-১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) থাকে। আপনি যদি পেটের ডান দিকের নিচের অংশে আলতো করে চাপ দেন, শিশু ব্যথায় চিৎকার করে উঠতে পারে। এমনকি চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়। চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো বিকল্প চিকিৎসা আছে? অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিশ্চিত হলে এর একমাত্র এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হলো অপারেশন বা সার্জারির মাধ্যমে ফুলে যাওয়া এবং ইনফেকশনযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্সটি শরীর থেকে কেটে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘অ্যাপেন্ডিসেকটমি’ (Appendectomy)। ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো ব্যথা কমানো যায়, কিন্তু এতে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি করা উচিত। বর্তমানে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সার্জারিটি প্রধানত অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক (Laparoscopic) পদ্ধতিতে করা হয়। এই পদ্ধতিতে পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। পেটে ছোট ছোট তিনটি ফুটো করে ক্যামেরা এবং বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে বের করে আনা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা হলো এতে শিশুর কষ্ট কম হয়, পেটে বড় কোনো দাগ থাকে না এবং শিশু মাত্র এক বা দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে। তবে অবস্থা খুব জটিল হলে সার্জন ওপেন সার্জারি বা পেট কেটে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। চিকিৎসা না করালে বা দেরি করলে কী হতে পারে? অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে সময়ই হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। লক্ষণ শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক চিকিৎসা না হলে ফুলে থাকা অ্যাপেন্ডিক্সটি অতিরিক্ত চাপে ফেটে যেতে পারে (Ruptured Appendix)। এটি একটি অত্যন্ত ভয়ংকর পরিস্থিতি। অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেলে ভেতরের সমস্ত পুঁজ, মল এবং জীবাণু পুরো পেটের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পুরো পেটে মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়, যাকে ‘পেরিটোনাইটিস’ (Peritonitis) বলে। তখন শিশুর সারা পেট ফুলে যায়, প্রচণ্ড জ্বর আসে, বারবার বমি হয় এবং রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে শিশুর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় সার্জারি করা অনেক জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং শিশুকে দীর্ঘ সময় আইসিইউ বা হাসপাতালে থাকতে হতে পারে। অ্যাপেন্ডিক্স ছাড়া শিশু কি সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে? অনেক বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন থাকে, অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেললে ভবিষ্যতে শিশুর কোনো সমস্যা হবে কি না। এর উত্তর হলো—একেবারেই না। আগেই বলা হয়েছে, মানবদেহে অ্যাপেন্ডিক্সের কোনো অপরিহার্য কাজ নেই। এটি কেটে ফেলে দিলে শিশুর হজমশক্তি, শারীরিক বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। সফল অপারেশনের পর শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার ভয় থাকে না। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: অবহেলা নয়, প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা শিশুর পেট ব্যথাকে কখনোই সাধারণ গ্যাস বা বদহজম ভেবে অবহেলা করবেন না বা নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ খাইয়ে ব্যথা কমিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না। ব্যথার ওষুধ আসল রোগকে লুকিয়ে রাখে, যা পরে ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। আপনার দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে আপনার অমূল্য রতনকে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা শিশুদের পেট ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। একজন দক্ষ পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শিশুর লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করেন। এরপর অত্যাধুনিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি শিশুর দ্রুত ও নিরাপদ আরোগ্য নিশ্চিত করেন, যাতে আপনার সন্তান আবার তার প্রাণবন্ত হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে তুলতে পারে।

Pediatric Surgeron Dr. Prosenjit Datta counseling the gurdians of a 2 years old boy who have recently been diagnosed with undescended testes
Awareness, Parenting

শিশুর অণ্ডকোষ যথাস্থানে না থাকা – Undescended Testes

ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে কেন দ্রুত চিকিৎসা প্রয়োজন? আনডিসেনডেড টেস্টিস বা ক্রিপটোরকিডিজম কী? মা-বাবার কাছে নবজাতক শিশুর আগমন এক স্বর্গীয় অনুভূতি। জন্মের পর চিকিৎসকরা যখন শিশুর সম্পূর্ণ শরীর পরীক্ষা করেন, তখন ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো অণ্ডকোষ বা টেস্টিস ঠিক জায়গায় আছে কি না তা দেখা। আনডিসেনডেড টেস্টিস (Undescended Testes) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ তার নির্দিষ্ট থলিতে (স্ক্রোটামে) নেমে আসে না। সহজ কথায়, অণ্ডকোষের থলিটি খালি বা অপূর্ণ থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ক্রিপটোরকিডিজম (Cryptorchidism) বলা হয়, যার অর্থ ‘লুকানো অণ্ডকোষ’। এটি সাধারণত অপরিণত বা নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম নেওয়া (প্রিম্যাচিউর) শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি দেখা যায়, তবে স্বাভাবিক সময়ে জন্ম নেওয়া শিশুদেরও এই সমস্যা হতে পারে। এটি এমন একটি সমস্যা যা বাইরে থেকে দেখে ভয়ানক কিছু মনে না হলেও শিশুর ভবিষ্যতের জন্য এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। কেন অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না? এই সমস্যাটি বোঝার জন্য আমাদের একটু পেছনে ফিরে যেতে হবে, যখন শিশু মায়ের গর্ভে ছিল। গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে, কিডনির ঠিক নিচেই তৈরি হতে শুরু করে। গর্ভাবস্থার শেষের দিকে (সাধারণত অষ্টম বা নবম মাসে) পেটের ভেতরের হরমোনের প্রভাবে এই অণ্ডকোষগুলো একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে ধীরে ধীরে নিচে নেমে এসে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে জমা হয়। এটি একটি অত্যন্ত জটিল প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। কিন্তু জিনগত ত্রুটি, মায়ের গর্ভাবস্থায় সঠিক হরমোনের অভাব, বা অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পথে শারীরিক কোনো বাধা থাকলে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াটি মাঝপথেই থেমে যায়। ফলে অণ্ডকোষ পেটের ভেতরে বা কুঁচকির কাছাকাছি কোনো এক জায়গায় আটকে থাকে, থলি পর্যন্ত আর পৌঁছাতে পারে না। বাবা-মা কীভাবে এই সমস্যাটি ধরতে পারবেন? আনডিসেনডেড টেস্টিসের সবচেয়ে প্রধান এবং একমাত্র লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি খালি অনুভব হওয়া। বাবা-মা যখন শিশুকে গোসল করান বা কাপড় পরান, তখন তারা খেয়াল করতে পারেন যে শিশুর অণ্ডকোষের থলির এক পাশ বা উভয় পাশ স্বাভাবিকের চেয়ে ছোট বা চুপসানো দেখাচ্ছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করলে থলির ভেতরে শক্ত গোলাকার অণ্ডকোষটি খুঁজে পাওয়া যায় না। শিশু এতে কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা তার প্রস্রাবেও কোনো সমস্যা হয় না। তবে মাঝে মাঝে অণ্ডকোষটি কুঁচকির কাছে ফুলে থাকতে দেখা যেতে পারে। অনেক সময় শিশুর অণ্ডকোষ একবার নিচে নামে আবার উপরে উঠে যায়, যাকে ‘রিট্রাকটাইল টেস্টিস’ বলে। এটি একটি ভিন্ন অবস্থা যা সাধারণত সময়ের সাথে ঠিক হয়ে যায়। কিন্তু আনডিসেনডেড টেস্টিস কখনোই থলিতে থাকে না। এটি নিশ্চিত হওয়ার জন্য চিকিৎসকের শারীরিক পরীক্ষাই যথেষ্ট। চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো ওষুধের চিকিৎসা আছে? আনডিসেনডেড টেস্টিসের চিকিৎসায় সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস পর্যন্ত চিকিৎসকরা সাধারণত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন, কারণ এই সময়ের মধ্যে হরমোনের প্রভাবে আটকে থাকা অণ্ডকোষ নিজে থেকেই নিচে নেমে আসতে পারে। কিন্তু শিশুর বয়স ছয় মাস পার হয়ে গেলে আর অপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ এরপর প্রাকৃতিকভাবে অণ্ডকোষ নিচে নামার কোনো সম্ভাবনা থাকে না। এর জন্য কোনো ওষুধ বা হরমোন ইনজেকশন কার্যকর নয়। একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা হলো সার্জারি, যাকে ‘অরকিডোপেক্সি’ (Orchidopexy) বলা হয়। এই অপারেশন সাধারণত শিশুর ৬ মাস থেকে ১৮ মাস বয়সের মধ্যেই করে ফেলা সবচেয়ে ভালো। সার্জারিতে সার্জন কুঁচকির কাছে ছোট একটি অংশ কেটে আটকে থাকা অণ্ডকোষটি খুঁজে বের করেন এবং সেটিকে সতর্কতার সাথে নিচে নামিয়ে থলির ভেতর সুতোর সাহায্যে আটকে দেন। যদি অণ্ডকোষটি পেটের অনেক গভীরে থাকে এবং বাইরে থেকে স্পর্শ করে বোঝা না যায়, তবে অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির (ক্যামেরা দিয়ে পেটের ভেতর দেখা) মাধ্যমে সেটিকে খুঁজে বের করে নিচে নামিয়ে আনা হয়। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের মারাত্মক জটিলতা হতে পারে? এই সমস্যাটি যদি সময়মতো অপারেশন করে ঠিক করা না হয়, তবে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে দুটি মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। প্রথমত, বন্ধ্যত্ব (Infertility)। অণ্ডকোষের প্রধান কাজ হলো শুক্রাণু বা স্পার্ম তৈরি করা। শুক্রাণু তৈরির জন্য শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে কিছুটা কম তাপমাত্রার প্রয়োজন হয়, যে কারণেই প্রকৃতি অণ্ডকোষকে শরীরের বাইরে থলিতে রেখেছে। পেটের ভেতরের তাপমাত্রা অনেক বেশি থাকে। তাই অণ্ডকোষ দীর্ঘদিন পেটের ভেতরে থাকলে অতিরিক্ত গরমে সেটি নষ্ট হয়ে যায় এবং শুক্রাণু তৈরির ক্ষমতা চিরতরে হারিয়ে ফেলে, ফলে শিশু ভবিষ্যতে বাবা হওয়ার সক্ষমতা হারায়। দ্বিতীয়ত, টেস্টিকুলার ক্যান্সার (Testicular Cancer)। যে অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসে না, ভবিষ্যতে সেই অণ্ডকোষে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি থাকে। সময়মতো সার্জারি করলে এই ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্য হারে কমানো সম্ভব। শিশুর বেড়ে ওঠা কেমন হবে? সঠিক সময়ে এবং সঠিক বয়সে (৬ থেকে ১৮ মাস) আনডিসেনডেড টেস্টিসের অপারেশন সম্পন্ন হলে শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে আর কোনো দুশ্চিন্তা থাকে না। অপারেশন করা অণ্ডকোষটি থলির ভেতরে স্বাভাবিকভাবেই বড় হতে থাকে এবং শিশুর প্রজনন ক্ষমতা বা বাবা হওয়ার সক্ষমতা অনেকটাই সুরক্ষিত থাকে। ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। অপারেশনের পর শিশু খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে এবং সাধারণ শিশুদের মতোই সব ধরনের শারীরিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে পারে। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: সচেতনতাই সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের চাবিকাঠি আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করতে। আজই গোসলের সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় আপনার শিশুর শারীরিক বিকাশ খেয়াল করুন। অণ্ডকোষের থলি খালি মনে হলে দেরি না করে দ্রুত পেডিয়াট্রিক সার্জনের শরণাপন্ন হোন। লোকলজ্জা বা ভয়ে চুপ করে থাকা আপনার সন্তানের সারাজীবনের কান্নার কারণ হতে পারে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা আনডিসেনডেড টেস্টিসের সার্জারি একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং সংবেদনশীল অপারেশন। অণ্ডকোষের সাথে যুক্ত রক্তনালী এবং শুক্রাণু চলাচলের নালীগুলো অত্যন্ত সরু থাকে। একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জন তাঁর বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং নিখুঁত হাতের জাদুতে এই রক্তনালীগুলোকে অক্ষত রেখে অণ্ডকোষকে সঠিক জায়গায় স্থাপন করেন, যা আপনার সন্তানের একটি সুস্থ ও সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করে।

Awareness

শিশুর অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া বা হাইড্রোসিল

কারণ, লক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসার বিস্তারিত গাইডলাইন হাইড্রোসিল বলতে কী বোঝায়? ছোট্ট ছেলে শিশুর বাবা-মায়েদের কাছে একটি খুব পরিচিত এবং চিন্তার বিষয় হলো শিশুর অণ্ডকোষের থলি বা স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া। অনেক সময় জন্মের পরপরই বা কয়েক মাস পরে বাবা-মা গোসল করানোর সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় খেয়াল করেন যে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ অস্বাভাবিকভাবে বড় দেখাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইড্রোসিল। গ্রিক শব্দ ‘হাইড্রো’ মানে পানি বা তরল এবং ‘সিল’ মানে থলি। অর্থাৎ, হাইড্রোসিল মানে হলো অণ্ডকোষের চারপাশের থলিতে তরল বা পানি জমে ফুলে যাওয়া। এটি দেখতে অনেকটা পানিভর্তি ছোট বেলুনের মতো মনে হতে পারে। এটি শুনলে যতটা ভয়ের মনে হয়, আসলে এটি ততটা বিপজ্জনক নয়। এটি একটি সাধারণ সমস্যা এবং এর অত্যন্ত কার্যকরী ও নিরাপদ চিকিৎসা রয়েছে। এটি কোনো ইনফেকশন বা ক্যান্সারের লক্ষণ নয়, তাই বাবা-মায়েদের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। কেন অণ্ডকোষে পানি জমে? হাইড্রোসিল হওয়ার পেছনের মূল কারণটি শিশুর মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সময়ের সাথে সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের ওপরের অংশে তৈরি হয়। জন্মের কাছাকাছি সময়ে এই অণ্ডকোষগুলো একটি ছোট সুড়ঙ্গ বা নালিপথ দিয়ে পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নেমে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে এসে অবস্থান নেয়। এই পথটি দিয়ে নিচে নামার সময় অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের একটি পাতলা পর্দার আবরণ সাথে করে নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পর এই সুড়ঙ্গপথটি নিজে থেকেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং অণ্ডকোষের চারপাশের তরল শরীর শুষে নেয়। কিন্তু অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এই সুড়ঙ্গপথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয় না। ফলে পেটের ভেতরের তরল বা পানি সেই খোলা পথ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে নিচে নেমে এসে অণ্ডকোষের চারপাশে জমতে থাকে। এই জমে থাকা পানির কারণেই অণ্ডকোষ ফুলে যায় এবং হাইড্রোসিলের সৃষ্টি হয়। একে ‘কমিউনিকেটিং হাইড্রোসিল’ বলা হয়। হাইড্রোসিল হলে শিশু কেমন আচরণ করে? হাইড্রোসিলের সবচেয়ে প্রধান এবং স্পষ্ট লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি ফুলে যাওয়া। এই ফোলাভাব ডান দিকে, বাম দিকে অথবা উভয় দিকেই হতে পারে। সাধারণত এই ফোলা অংশে শিশুর কোনো ব্যথা থাকে না। আপনি যদি ফোলা অংশটি আলতো করে স্পর্শ করেন, তবে সেটি নরম এবং মসৃণ মনে হবে, ঠিক যেন পানিভর্তি একটি থলি। মজার ব্যাপার হলো, এই ফোলাভাব সারাদিন এক রকম থাকে না। শিশু যখন রাতে ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয়, তখন পেটের ভেতরের পানি আবার পেটে ফিরে যায় বলে সকালে ফোলাভাব কম থাকে। কিন্তু সারাদিন খেলাধুলা করলে, কাঁদলে বা হাঁটাচলা করলে বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফোলাভাব অনেক বেড়ে যায়। হাইড্রোসিলের কারণে শিশুর প্রস্রাব করতে কোনো সমস্যা হয় না বা সাধারণত তার জ্বরও আসে না। তবে ফোলা অংশটি অনেক বড় হয়ে গেলে শিশুর চলাফেরা করতে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে। কখন এবং কীভাবে এর সমাধান করা হয়? হাইড্রোসিলের চিকিৎসায় সময়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে জন্মের পর প্রথম এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই ডাক্তাররা সাধারণত প্রথম এক-দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। এই সময়ে কোনো ওষুধ বা মালিশের প্রয়োজন নেই, কারণ ওষুধ দিয়ে এই পানি শুকানো সম্ভব নয়। কিন্তু শিশুর বয়স দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি হাইড্রোসিল না কমে, অথবা ফোলা অংশটি যদি প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে, তবে সার্জারি বা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সার্জারিটি খুবই সহজ এবং নিরাপদ। পেডিয়াট্রিক সার্জন কুঁচকির কাছে অত্যন্ত ছোট একটি অংশ কেটে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি (যেটি দিয়ে পানি আসছিল) সেলাই করে পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর ফলে পেটের তরল আর নিচে নামতে পারে না। আজকাল ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতেও অত্যন্ত সফলভাবে এবং কম সময়ে এই সার্জারি করা সম্ভব। চিকিৎসা না করালে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে? যদিও হাইড্রোসিল সাধারণত ব্যথামুক্ত থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন এটি চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, যে সুড়ঙ্গ দিয়ে পানি নিচে নামছে, সেটি যদি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে, তবে সেখান দিয়ে পেটের নাড়িভুঁড়িও নিচে নেমে আসতে পারে। তখন এটি ইনগুইনাল হার্নিয়াতে রূপান্তরিত হয়, যা একটি জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। এছাড়া, অণ্ডকোষের চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে থাকলে সেই পানির চাপে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে শিশুর অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে তার প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা হাইড্রোসিলের অপারেশনের পর শিশুর সুস্থ হওয়ার হার প্রায় শতভাগ। এটি একটি ‘ডে-কেয়ার’ সার্জারি, অর্থাৎ শিশু সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপারেশন শেষে ওই দিনই বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। অপারেশনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই শিশু তার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসে। এই সার্জারির কারণে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো প্রভাব পড়ে না, বরং এটি তার অণ্ডকোষের সুস্থ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। পুনরায় হাইড্রোসিল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই বিরল। পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ধৈর্য এবং সঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত শিশুর শরীরের যেকোনো পরিবর্তন বাবা-মায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে হাইড্রোসিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান। কুসংস্কার বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে সঠিক সময়ে পেডিয়াট্রিক সার্জনের কাছে যান। আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানকে একটি সুস্থ জীবন উপহার দিতে। পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন কেবল সার্জারিই করেন না, তিনি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং হাইড্রোসিলের ধরন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন। কখন অপেক্ষা করতে হবে আর কখন সার্জারি করতে হবে—এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রহণ করে তিনি আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করেন।

Scroll to Top