Dr. Prosenjit Datta

শিশুর অণ্ডকোষ ফুলে যাওয়া বা হাইড্রোসিল

কারণ, লক্ষণ ও সঠিক চিকিৎসার বিস্তারিত গাইডলাইন

হাইড্রোসিল বলতে কী বোঝায়?

ছোট্ট ছেলে শিশুর বাবা-মায়েদের কাছে একটি খুব পরিচিত এবং চিন্তার বিষয় হলো শিশুর অণ্ডকোষের থলি বা স্ক্রোটাম ফুলে যাওয়া। অনেক সময় জন্মের পরপরই বা কয়েক মাস পরে বাবা-মা গোসল করানোর সময় বা ডায়াপার বদলানোর সময় খেয়াল করেন যে শিশুর এক বা উভয় অণ্ডকোষ অস্বাভাবিকভাবে বড় দেখাচ্ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় হাইড্রোসিল। গ্রিক শব্দ ‘হাইড্রো’ মানে পানি বা তরল এবং ‘সিল’ মানে থলি। অর্থাৎ, হাইড্রোসিল মানে হলো অণ্ডকোষের চারপাশের থলিতে তরল বা পানি জমে ফুলে যাওয়া। এটি দেখতে অনেকটা পানিভর্তি ছোট বেলুনের মতো মনে হতে পারে। এটি শুনলে যতটা ভয়ের মনে হয়, আসলে এটি ততটা বিপজ্জনক নয়। এটি একটি সাধারণ সমস্যা এবং এর অত্যন্ত কার্যকরী ও নিরাপদ চিকিৎসা রয়েছে। এটি কোনো ইনফেকশন বা ক্যান্সারের লক্ষণ নয়, তাই বাবা-মায়েদের অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

কেন অণ্ডকোষে পানি জমে?

হাইড্রোসিল হওয়ার পেছনের মূল কারণটি শিশুর মাতৃগর্ভে বেড়ে ওঠার সময়ের সাথে সম্পর্কিত। গর্ভাবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের ওপরের অংশে তৈরি হয়। জন্মের কাছাকাছি সময়ে এই অণ্ডকোষগুলো একটি ছোট সুড়ঙ্গ বা নালিপথ দিয়ে পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে নিচে নেমে স্ক্রোটাম বা অণ্ডকোষের থলিতে এসে অবস্থান নেয়। এই পথটি দিয়ে নিচে নামার সময় অণ্ডকোষ পেটের ভেতরের একটি পাতলা পর্দার আবরণ সাথে করে নিয়ে আসে। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী, অণ্ডকোষ নিচে নেমে আসার পর এই সুড়ঙ্গপথটি নিজে থেকেই পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় এবং অণ্ডকোষের চারপাশের তরল শরীর শুষে নেয়। কিন্তু অনেক শিশুর ক্ষেত্রেই এই সুড়ঙ্গপথটি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয় না। ফলে পেটের ভেতরের তরল বা পানি সেই খোলা পথ দিয়ে চুইয়ে চুইয়ে নিচে নেমে এসে অণ্ডকোষের চারপাশে জমতে থাকে। এই জমে থাকা পানির কারণেই অণ্ডকোষ ফুলে যায় এবং হাইড্রোসিলের সৃষ্টি হয়। একে ‘কমিউনিকেটিং হাইড্রোসিল’ বলা হয়।

হাইড্রোসিল হলে শিশু কেমন আচরণ করে?

হাইড্রোসিলের সবচেয়ে প্রধান এবং স্পষ্ট লক্ষণ হলো অণ্ডকোষের থলি ফুলে যাওয়া। এই ফোলাভাব ডান দিকে, বাম দিকে অথবা উভয় দিকেই হতে পারে। সাধারণত এই ফোলা অংশে শিশুর কোনো ব্যথা থাকে না। আপনি যদি ফোলা অংশটি আলতো করে স্পর্শ করেন, তবে সেটি নরম এবং মসৃণ মনে হবে, ঠিক যেন পানিভর্তি একটি থলি। মজার ব্যাপার হলো, এই ফোলাভাব সারাদিন এক রকম থাকে না। শিশু যখন রাতে ঘুমায় বা বিশ্রাম নেয়, তখন পেটের ভেতরের পানি আবার পেটে ফিরে যায় বলে সকালে ফোলাভাব কম থাকে। কিন্তু সারাদিন খেলাধুলা করলে, কাঁদলে বা হাঁটাচলা করলে বিকেলে বা সন্ধ্যায় ফোলাভাব অনেক বেড়ে যায়। হাইড্রোসিলের কারণে শিশুর প্রস্রাব করতে কোনো সমস্যা হয় না বা সাধারণত তার জ্বরও আসে না। তবে ফোলা অংশটি অনেক বড় হয়ে গেলে শিশুর চলাফেরা করতে কিছুটা অস্বস্তি হতে পারে।

কখন এবং কীভাবে এর সমাধান করা হয়?

হাইড্রোসিলের চিকিৎসায় সময়ের একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। যেহেতু অনেক ক্ষেত্রে জন্মের পর প্রথম এক থেকে দুই বছরের মধ্যে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাই ডাক্তাররা সাধারণত প্রথম এক-দেড় বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরামর্শ দেন। এই সময়ে কোনো ওষুধ বা মালিশের প্রয়োজন নেই, কারণ ওষুধ দিয়ে এই পানি শুকানো সম্ভব নয়। কিন্তু শিশুর বয়স দুই বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও যদি হাইড্রোসিল না কমে, অথবা ফোলা অংশটি যদি প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে, তবে সার্জারি বা অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। এই সার্জারিটি খুবই সহজ এবং নিরাপদ। পেডিয়াট্রিক সার্জন কুঁচকির কাছে অত্যন্ত ছোট একটি অংশ কেটে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি (যেটি দিয়ে পানি আসছিল) সেলাই করে পুরোপুরি বন্ধ করে দেন। এর ফলে পেটের তরল আর নিচে নামতে পারে না। আজকাল ল্যাপারোস্কোপিক পদ্ধতিতেও অত্যন্ত সফলভাবে এবং কম সময়ে এই সার্জারি করা সম্ভব।

চিকিৎসা না করালে কী ধরনের জটিলতা হতে পারে?

যদিও হাইড্রোসিল সাধারণত ব্যথামুক্ত থাকে, কিন্তু দীর্ঘদিন এটি চিকিৎসা না করে ফেলে রাখা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সবচেয়ে বড় চিন্তার বিষয় হলো, যে সুড়ঙ্গ দিয়ে পানি নিচে নামছে, সেটি যদি আস্তে আস্তে বড় হতে থাকে, তবে সেখান দিয়ে পেটের নাড়িভুঁড়িও নিচে নেমে আসতে পারে। তখন এটি ইনগুইনাল হার্নিয়াতে রূপান্তরিত হয়, যা একটি জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থা। এছাড়া, অণ্ডকোষের চারপাশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচুর পরিমাণে পানি জমে থাকলে সেই পানির চাপে অণ্ডকোষের স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে শিশুর অণ্ডকোষের স্বাভাবিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা ভবিষ্যতে তার প্রজনন ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

শিশুর স্বাভাবিক জীবনে ফেরা

হাইড্রোসিলের অপারেশনের পর শিশুর সুস্থ হওয়ার হার প্রায় শতভাগ। এটি একটি ‘ডে-কেয়ার’ সার্জারি, অর্থাৎ শিশু সকালে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে অপারেশন শেষে ওই দিনই বিকেলে বা সন্ধ্যায় হাসিমুখে বাড়ি ফিরে যেতে পারে। অপারেশনের পর কয়েক দিনের মধ্যেই শিশু তার স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসে। এই সার্জারির কারণে শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনে কোনো প্রভাব পড়ে না, বরং এটি তার অণ্ডকোষের সুস্থ ও স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত করে। পুনরায় হাইড্রোসিল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই বিরল।

পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ধৈর্য এবং সঠিক সময়ের সিদ্ধান্ত

শিশুর শরীরের যেকোনো পরিবর্তন বাবা-মায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। তবে হাইড্রোসিলের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ধৈর্য এবং সঠিক চিকিৎসকের তত্ত্বাবধান। কুসংস্কার বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার ওপর ভরসা না করে সঠিক সময়ে পেডিয়াট্রিক সার্জনের কাছে যান। আপনার একটু সচেতনতাই পারে সন্তানকে একটি সুস্থ জীবন উপহার দিতে।

পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা

একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন কেবল সার্জারিই করেন না, তিনি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং হাইড্রোসিলের ধরন নিখুঁতভাবে বিশ্লেষণ করেন। কখন অপেক্ষা করতে হবে আর কখন সার্জারি করতে হবে—এই সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে গ্রহণ করে তিনি আপনার শিশুর জন্য সবচেয়ে নিরাপদ এবং দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করেন।

পরের প্রকাশনা

দয়া করে আপনার মতামত দিন অথবা প্রশ্ন করুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Dr. Prosenjit Datta_sitting inside OT_waiting for the next surgery to begin

অ্যাপয়েন্টমেন্ট বুক করতে প্রস্তুত,

নাকি আরও কিছু জানতে চান ?

Scroll to Top