শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে আপনি কি করবেন?


রেকটাল/মলাশয়ের পলিপ কী?
শিশুর ডায়াপারে বা মলত্যাগের পর প্যানে যদি তাজা রক্ত দেখা যায়, তবে যেকোনো বাবা-মায়ের জন্যই তা চরম আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মনে নানা রকম ভয়ংকর রোগের চিন্তা উঁকি দিতে থাকে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে মলত্যাগের সময় রক্ত পড়ার অন্যতম প্রধান এবং একটি সাধারণ কারণ হলো ‘রেকটাল পলিপ’ (Rectal Polyp)। এটি আসলে তেমন ভয় পাওয়ার মতো কোনো রোগ নয়। সহজ কথায়, রেকটাল পলিপ হলো শিশুর মলাশয় বা পায়ুপথের (Rectum) ভেতরের দিকের নরম দেয়ালে ছোট মাংসপিণ্ড বা আঙুরের মতো একটি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি। এটি দেখতে অনেকটা ছোট একটি মাশরুমের মতো, যার একটি বোঁটা থাকে এবং বোঁটার মাথায় একটি গোল অংশ থাকে। শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২ থেকে ১০ বছর বয়সের মধ্যে এটি বেশি দেখা যায়, যাকে ‘জুভেনাইল পলিপ’ বলা হয়। মনে রাখা ভালো, শিশুদের এই পলিপগুলো সাধারণত সম্পূর্ণ নির্দোষ বা বিনাইন (Benign) হয়ে থাকে, অর্থাৎ এগুলো থেকে ক্যান্সার হওয়ার কোনো সম্ভাবনা থাকে না বললেই চলে।
কেন পায়ুপথে এই ধরনের মাংসপিণ্ড তৈরি হয়?
শিশুদের মলাশয়ে কেন পলিপ তৈরি হয়, তার সঠিক এবং সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ এখনো পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, এর পেছনে বেশ কিছু কারণ থাকতে পারে। অনেক সময় মলাশয়ের ভেতরের স্তরের (মিউকোসা) কোষগুলো কোনো কারণে অতিরিক্ত মাত্রায় বিভাজিত হতে শুরু করলে তা ফুলে উঠে এমন মাংসপিণ্ডের আকার ধারণ করে। এছাড়া ক্রনিক বা দীর্ঘমেয়াদি অ্যালার্জি, পেটের ভেতরে কোনো ইনফেকশন বা প্রদাহ থাকলে সেখান থেকেও পলিপ তৈরি হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি জেনেটিক বা বংশগত কারণেও হতে পারে; অর্থাৎ পরিবারে যদি আগে কারও পলিপের সমস্যা থেকে থাকে, তবে শিশুরও এটি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি বিক্ষিপ্তভাবে তৈরি হয় এবং এর সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।
বাবা-মা কীভাবে বুঝবেন শিশুর পলিপ হয়েছে?
রেকটাল পলিপের সবচেয়ে প্রধান এবং দৃশ্যমান লক্ষণ হলো মলত্যাগের সময় সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত তাজা রক্ত পড়া। শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের গায়ে লেগে বা মলের শেষে ফোঁটা ফোঁটা লাল তাজা রক্ত পড়তে দেখা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই রক্ত পড়ার সময় শিশু কোনো ব্যথা অনুভব করে না বা কান্নাকাটি করে না, যা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে মলদ্বার ছিঁড়ে যাওয়ার (অ্যানাল ফিশার) ব্যথার চেয়ে একদম আলাদা। অনেক সময় পলিপটি যদি মলদ্বারের খুব কাছাকাছি থাকে বা এর বোঁটা অনেক লম্বা হয়, তবে মলত্যাগের সময় যখন শিশু কোঁত দেয়, তখন সেই ছোট গোলাকার লাল বা গাঢ় গোলাপি রঙের মাংসপিণ্ডটি পায়ুপথ দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে। মলত্যাগ শেষ হলে এটি নিজে থেকেই আবার ভেতরে চলে যায় বা অনেক সময় হাত দিয়ে আলতো করে ভেতরে ঢুকিয়ে দিতে হয়। এছাড়া মাঝে মাঝে মলের সাথে মিউকাস বা আমাশয়ের মতো পিচ্ছিল পদার্থও যেতে পারে।
ওষুধে কি কাজ হয় নাকি সার্জারি প্রয়োজন?
অনেকেই মনে করেন ওষুধ খেলে হয়তো এই মাংসপিণ্ড শুকিয়ে বা ঝরে পড়ে যাবে। কিন্তু বাস্তব সত্য হলো, রেকটাল পলিপের জন্য কোনো কার্যকরী ওষুধ নেই। এর একমাত্র সমাধান হলো একটি ছোট এবং সহজ সার্জারির মাধ্যমে পলিপটি কেটে শরীর থেকে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘পলিপেকটমি’ (Polypectomy)। এই সার্জারিটি অত্যন্ত সহজ এবং নিরাপদ। যদি পলিপটি মলদ্বারের খুব কাছে থাকে, তবে সার্জন পায়ুপথ দিয়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে পলিপের বোঁটাটি বেঁধে তা কেটে বের করে আনেন, এর জন্য পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। আর যদি পলিপটি মলাশয়ের একটু ভেতরের দিকে থাকে, তবে ‘কলোনোস্কোপি’ (Colonoscopy) বা এন্ডোস্কোপির মাধ্যমে একটি ফ্লেক্সিবল টিউব ও ক্যামেরার সাহায্যে ভেতরে গিয়ে পেট না কেটেই অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপটি অপসারণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় শিশু একেবারেই কোনো ব্যথা পায় না এবং সার্জারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেতে পারে।
চিকিৎসা না করালে কী ধরনের ক্ষতি হতে পারে?
যদিও শিশুদের রেকটাল পলিপ থেকে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি নেই, তবুও একে অবহেলা করে ফেলে রাখা একেবারেই উচিত নয়। পলিপের গায়ে প্রচুর রক্তনালী থাকে এবং এটি অত্যন্ত নরম হয়। তাই শিশু যখন মলত্যাগ করে, তখন মলের ঘষায় পলিপের গা থেকে প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণ হতে থাকে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে অল্প অল্প করে রক্ত যেতে থাকলে শিশু একসময় মারাত্মক রক্তশূন্যতায় (Anemia) ভুগতে শুরু করে। রক্তশূন্যতার কারণে শিশু দুর্বল হয়ে পড়ে, তার স্বাভাবিক শারীরিক বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায় এবং পড়াশোনা বা খেলাধুলায় সে মনোযোগ হারিয়ে ফেলে। এছাড়া অনেক সময় বড় পলিপ মলাশয়ের পথ আংশিক বন্ধ করে দিয়ে পেটে ব্যথা বা অন্ত্রের জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
একবার কাটার পর কি আবার হতে পারে?
রেকটাল পলিপ অপসারণ করার পর শিশু খুব দ্রুত তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যায় এবং রক্ত পড়া তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। যে পলিপটি কেটে ফেলা হয়, সেটি সাধারণত আর ফিরে আসে না। বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে জীবনে একবারই এই সমস্যা হয় এবং চিকিৎসা শেষে তারা সম্পূর্ণ সুস্থ জীবনযাপন করে। খুব অল্প কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যাদের বংশগত প্রবণতা আছে, তাদের ভবিষ্যতে নতুন করে অন্য জায়গায় পলিপ হতে পারে। কেটে ফেলা পলিপটি প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার (বায়োপসি) জন্য পাঠানো হয়, যাতে নিশ্চিত হওয়া যায় যে এটি সম্পূর্ণ নির্দোষ একটি টিউমার মাত্র।
পিতামাতার জন্য শিক্ষা: ভয়ের অন্ধকার থেকে আশার আলোতে
শিশুর রক্তপাত দেখে যেকোনো বাবা-মায়ের ভয় পাওয়াটা অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মনে রাখবেন, আতঙ্কিত হয়ে ভুল পথে পা বাড়াবেন না। একটু সাহস করে চিকিৎসকের কাছে যান। আপনার সঠিক সময়ে নেওয়া পদক্ষেপে আপনার শিশু আবার ফিরে পাবে তার আগের সেই প্রাণবন্ত হাসি এবং সুস্থ জীবন।
পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা
একজন পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এবং সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত উপায়ে শিশুর পায়ুপথ পরীক্ষা করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে রক্তপাতের কারণটি কেবল পলিপ, অন্য কোনো জটিল রোগ নয়। অত্যন্ত নিখুঁতভাবে পলিপ অপসারণের মাধ্যমে তিনি শিশুর রক্তপাত চিরতরে বন্ধ করেন এবং উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের মনে স্বস্তি ও শান্তি ফিরিয়ে আনেন।