Dr. Prosenjit Datta

শিশুদের কুঁচকিতে বা অণ্ডকোষে ফোলাভাব: ইনগুইনাল হার্নিয়া

ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia) সম্পর্কে বিস্তারিত জানুন, ভয় নয় প্রয়োজন সচেতনতা

যখন একটি পরিবারে নতুন অতিথির আগমন ঘটে, তখন বাবা-মায়ের আনন্দের সীমা থাকে না। কিন্তু এই আনন্দের মাঝে যদি হঠাৎ দেখা যায় শিশুর কুঁচকি বা অণ্ডকোষের থলি ফুলে আছে, তখন স্বভাবতই বাবা-মা প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যান। ডাক্তারি ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় ইনগুইনাল হার্নিয়া। সহজ কথায় বলতে গেলে, ইনগুইনাল হার্নিয়া হলো পেটের ভেতরের কোনো অংশ, যেমন নাড়িভুঁড়ি বা চর্বি, পেটের দেয়ালের একটি দুর্বল জায়গা বা ছোট ছিদ্র দিয়ে বাইরের দিকে বেরিয়ে আসা। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ফোলাভাব সাধারণত কুঁচকির অংশে বা ছেলেদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষের থলিতে (স্ক্রোটাম) এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে যৌনাঙ্গের বাইরের অংশে দেখা যায়। এটি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয় বা বাবা-মায়ের কোনো ভুলের কারণেও এটি হয় না। এটি সম্পূর্ণ জন্মগত একটি শারীরিক গঠনতান্ত্রিক অসম্পূর্ণতা। অনেক বাবা-মা মনে করেন শিশু বেশি কাঁদার কারণে হার্নিয়া হয়েছে, কিন্তু বিষয়টি তা নয়; বরং হার্নিয়া আগে থেকেই থাকে এবং শিশু যখন কাঁদে তখন পেটের ভেতরের চাপ বেড়ে যাওয়ায় সেটি স্পষ্টভাবে ফুলে ওঠে।

শিশুর জন্মের অনেক আগে, যখন সে মায়ের গর্ভে একটু একটু করে বেড়ে ওঠে, তখন তার শরীরের ভেতরে অনেক চমৎকার পরিবর্তন ঘটে। ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে তাদের অণ্ডকোষ প্রথমে পেটের ভেতরে কিডনির কাছাকাছি তৈরি হয়। জন্মের কয়েক সপ্তাহ আগে এই অণ্ডকোষগুলো পেটের ভেতর থেকে একটি সরু রাস্তা বা সুড়ঙ্গের মাধ্যমে নিচে নেমে এসে অণ্ডকোষের থলিতে জমা হয়। মেয়েদের ক্ষেত্রেও পেটের ভেতর থেকে একটি লিগামেন্ট বা সংযোগকারী টিস্যু ঠিক একইভাবে কুঁচকির দিকে নেমে আসে। প্রাকৃতিকভাবে শিশু জন্মের আগেই বা জন্মের পরপরই এই রাস্তাটি বা সুড়ঙ্গটি নিজে থেকেই সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই সুড়ঙ্গটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তবে পেটের ভেতরের একটি ফাঁকা রাস্তা বা পকেট থেকে যায়। শিশু যখন কান্নাকাটি করে, হাঁচি-কাশি দেয় বা মলত্যাগের সময় কোঁত দেয়, তখন পেটের ভেতরের চাপ বেড়ে যায়। এই চাপের ফলে পেটের ভেতরের নাড়িভুঁড়ি (অন্ত্র) বা জলীয় অংশ সেই খোলা সুড়ঙ্গ দিয়ে নিচে নেমে আসে। এভাবেই শিশুর কুঁচকি বা অণ্ডকোষ ফুলে যায় এবং ইনগুইনাল হার্নিয়ার সৃষ্টি হয়।

ইনগুইনাল হার্নিয়ার সবচেয়ে সাধারণ এবং প্রথম লক্ষণ হলো কুঁচকিতে বা অণ্ডকোষে একটি নরম ফোলাভাব দেখতে পাওয়া। প্রথমদিকে এই ফোলাভাব সব সময় থাকে না। আপনি হয়তো খেয়াল করবেন, শিশু যখন একটানা অনেকক্ষণ কাঁদে, জেদ করে, হাসে, দৌড়ঝাঁপ করে বা শক্ত পায়খানা করার সময় অতিরিক্ত চাপ দেয়, ঠিক তখনই এই ফোলা অংশটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আবার শিশু যখন শান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে বা পিঠের ওপর ভর দিয়ে শুয়ে থাকে, তখন ফোলা অংশটি নিজে থেকেই পেটের ভেতরে চলে যায় এবং ওই জায়গাটি একদম স্বাভাবিক মনে হয়। সাধারণত এই অবস্থায় শিশুর কোনো ব্যথা বা কষ্ট থাকে না, সে স্বাভাবিকভাবেই খেলাধুলা করে এবং খায়দায়। তবে মাঝে মাঝে এই ফোলা অংশটি পেটের ভেতরে ফেরত যেতে চায় না। তখন শিশু প্রচণ্ড কান্নাকাটি করতে পারে, তার পেট ফুলে যেতে পারে এবং সে বমি করতে পারে। এমন পরিস্থিতি দেখলে বুঝতে হবে হার্নিয়াটি আটকে গেছে, যা একটি জরুরি অবস্থা।

নেক অভিভাবক জানতে চান ইনগুইনাল হার্নিয়া ওষুধ খাইয়ে বা মালিশ করে সারিয়ে তোলা সম্ভব কি না। এর খুব স্পষ্ট উত্তর হলো—না। যেহেতু এটি একটি জন্মগত খোলা রাস্তা বা ছিদ্র, তাই পৃথিবীর কোনো ওষুধ বা বেল্ট দিয়ে এই ছিদ্র বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর একমাত্র বিজ্ঞানসম্মত এবং স্থায়ী চিকিৎসা হলো সার্জারি বা অপারেশন। যখনই শিশুর হার্নিয়া শনাক্ত হবে, যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি করে নেওয়া উচিত, এর জন্য শিশুর বড় হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন নেই। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে হার্নিয়ার সার্জারি অত্যন্ত নিরাপদ। এটি মূলত দুইভাবে করা যায়: ওপেন সার্জারি এবং ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারি। ওপেন সার্জারিতে কুঁচকির কাছে খুব ছোট একটি কাটা ছেঁড়া করে সেই খোলা সুড়ঙ্গটি সেলাই করে বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্যদিকে, অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারিতে পেট না কেটেই পেটে সূক্ষ্ম ছিদ্র করে ক্যামেরার সাহায্যে ভেতরের অবস্থা দেখে হার্নিয়ার ছিদ্রটি বন্ধ করা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা হলো এতে শিশুর কষ্ট অনেক কম হয়, রক্তপাত প্রায় হয়ই না এবং খুব দ্রুত শুকিয়ে যায়। সার্জন শিশুর অবস্থা বুঝে সবচেয়ে সঠিক পদ্ধতিটি বেছে নেন।

হার্নিয়া যদি সময়মতো অপারেশন করা না হয়, তবে তা শিশুর জীবনের জন্য মারাত্মক হুমকির কারণ হতে পারে। সবচেয়ে বড় ভয় হলো ‘ইনকার্সারেশন’ (Incarceration) বা ‘স্ট্র্যাংগুলেশন’ (Strangulation)। এর মানে হলো, পেটের যে নাড়িভুঁড়ি ওই সুড়ঙ্গ দিয়ে নিচে নেমে আসে, তা অনেক সময় সেখানে আটকে যায় এবং আর পেটের ভেতর ফেরত যেতে পারে না। আটকে পড়া নাড়িভুঁড়িতে যখন রক্ত চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তাকে স্ট্র্যাংগুলেশন বলে। রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওই নাড়িভুঁড়িতে পচন ধরতে শুরু করে (গ্যাংরিন)। তখন শিশুর প্রচণ্ড পেট ব্যথা হয়, বমি হতে থাকে এবং অবস্থা সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ছেলে শিশুদের ক্ষেত্রে আটকে থাকা হার্নিয়া অণ্ডকোষের রক্ত চলাচলেও বাধা দেয়, যার ফলে অণ্ডকোষ চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। মেয়েদের ক্ষেত্রে তাদের ডিম্বাশয় (ওভারি) ওই ছিদ্র দিয়ে নেমে আটকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই হার্নিয়া ফেলে রাখা মানে একটি টিকটিক করা বোমাকে সঙ্গী করে রাখা।

ইনগুইনাল হার্নিয়ার সার্জারি একটি অত্যন্ত সফল এবং নিরাপদ প্রক্রিয়া। সঠিক সময়ে অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে অপারেশন করা হলে শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে। অপারেশনের পর দিনই সাধারণত শিশু হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে এবং কয়েকদিনের মধ্যেই তার স্বাভাবিক খেলাধুলা শুরু করতে পারে। ভবিষ্যতে এই অপারেশনের কারণে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি, খেলাধুলা, পড়াশোনা বা পরবর্তীতে বাবা হওয়ার ক্ষেত্রে (ছেলেদের) কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। একবার সফলভাবে ছিদ্রটি বন্ধ করে দিলে সাধারণত ওই জায়গায় পুনরায় হার্নিয়া হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

আপনার ছোট্ট সোনামণির হাসিমুখ যেন ম্লান না হয়! কুঁচকিতে বা অণ্ডকোষে কোনো ফোলাভাব দেখলে ভয় পেয়ে তা লুকিয়ে রাখবেন না বা অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসার পেছনে ছুটে সময় নষ্ট করবেন না। শিশুর যেকোনো অস্বাভাবিকতা বাবা-মায়ের জন্য কষ্টের, কিন্তু আপনার একটি দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্তই পারে আপনার সন্তানকে একটি বড় বিপদের হাত থেকে রক্ষা করতে।

একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জন কেবল একটি অপারেশনই করেন না, তিনি শিশুর ভবিষ্যৎ সুস্থতা নিশ্চিত করেন। শিশুদের শরীর বড়দের মতো নয়, তাদের টিস্যু অত্যন্ত নরম এবং সূক্ষ্ম। তাই একজন অভিজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত যত্ন ও দক্ষতার সাথে সঠিক রোগ নির্ণয় করেন এবং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে নিখুঁতভাবে সার্জারি সম্পন্ন করেন। এতে আপনার শিশুর নিরাপদ, ব্যথামুক্ত এবং সম্পূর্ণ সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top