আপনার শিশুর কুঁচকিতে (Groin) বা অণ্ডকোষের কাছে হঠাৎ কোনো ফোলা অংশ দেখে ভয় পাচ্ছেন? বাবা-মা হিসেবে এমন দৃশ্য দেখে দুশ্চিন্তা হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। তবে আশার কথা হলো, শিশুদের কুঁচকির হার্নিয়া (Inguinal Hernia) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা এবং সঠিক সময়ে একজন পেডিয়াট্রিক সার্জনের চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ ও নিরাপদে নিরাময়যোগ্য। চলুন জেনে নিই এই সমস্যাটি কেন হয় এবং কখন আপনার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

✅ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি অত্যন্ত সাধারণ অস্ত্রোপচারজনিত রোগ।
✅ ছেলে শিশুদের মধ্যে এটি মেয়ে শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়।
✅ হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না।
✅ সময়মতো অপারেশন করলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়।
✅ হার্নিয়া আটকে গেলে এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
ইনগুইনাল হার্নিয়া কি?
ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পেটের ভেতরের কোনো অংশ—সাধারণত অন্ত্রের একটি অংশ—পেটের দেয়ালের একটি দুর্বল বা খোলা পথ দিয়ে কুঁচকির দিকে বেরিয়ে আসে। শিশুর কান্না, কাশি, হাসি বা চাপ দেওয়ার সময় এই ফোলা আরও স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক সময় শিশুটি শান্ত হয়ে গেলে বা ঘুমিয়ে পড়লে ফোলাটি আবার নিজে থেকেই ভেতরে চলে যায়। এই কারণেই অনেক অভিভাবক প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না।


কেন ইনগুইনাল হার্নিয়া হয়?
শিশুর শরীর মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ (Testis) পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অণ্ডথলিতে নেমে আসে। এই নামার সময় একটি ছোট পথ (Processus Vaginalis) তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবে জন্মের আগে বা জন্মের কিছুদিনের মধ্যে এই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তাহলে সেই পথ দিয়ে অন্ত্র বা পেটের অন্যান্য অংশ নিচে নেমে এসে হার্নিয়া তৈরি করতে পারে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি জন্মগত পথ খোলা থাকলে ইনগুইনাল হার্নিয়া হতে পারে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুর ইনগুইনাল হার্নিয়া জন্মগত (Congenital)।

ইনগুইনাল হার্নিয়ার লক্ষণ কি?
বাবা-মায়েরা সাধারণত শিশুর গোসল করানো বা ডায়াপার পরানোর সময় এই সমস্যাটি প্রথম খেয়াল করেন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো:
- কুঁচকি (Groin) বা অণ্ডকোষের (Scrotum) আশপাশে গোলাকার ফোলা অংশ দেখা যাওয়া।
- শিশু যখন কান্না করে, দৌড়াদৌড়ি করে, বা কোষ্ঠকাঠিন্যের কারণে কোঁথ দেয়, তখন এই ফোলা অংশটি বড় হয়ে যায়।
- শিশু যখন শান্ত থাকে বা ঘুমিয়ে পড়ে, তখন ফোলা অংশটি নিজে থেকেই পেটের ভেতর চলে যায় এবং জায়গাটি স্বাভাবিক দেখায়।
- বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটিতে কোনো ব্যথা থাকে না।

বিপজ্জনক লক্ষণ (Danger Signs)
- প্রচণ্ড ব্যথা
- ফোলা শক্ত হয়ে যাওয়া
- ফোলা আর ভেতরে না যাওয়া
- বমি হওয়া
- পেট ফুলে যাওয়া
- শিশুর অতিরিক্ত কান্না
- ফোলা লাল বা বেগুনি হয়ে যাওয়া

কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
- ফোলা অংশটি যদি লালচে, কালচে বা শক্ত হয়ে যায়
- ফোলা অংশটি আর পেটের ভেতর ফিরে না গেলে (Irreducible)
- শিশু যদি অতিরিক্ত কান্নাকাটি করে এবং স্পষ্টতই ব্যথায় কষ্ট পায়
- শিশুর পেট ফুলে গেলে এবং বমি (বিশেষ করে সবুজ রঙের বমি) হতে থাকলে
চিকিৎসা না করলে কী কী জটিলতা হতে পারে?
অনেকেই ভাবেন— “বাচ্চা একটু বড় হলে দেখবো।” এটি সবসময় নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়। চিকিৎসা না করলে হতে পারে—
- Incarcerated Hernia: হার্নিয়ার ভেতরে থাকা অন্ত্র আটকে যেতে পারে এবং আর ভেতরে ফিরে যেতে পারে না। এটি একটি জরুরি অবস্থা।
- Strangulated Hernia: আটকে থাকা অন্ত্রে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে অন্ত্রের অংশ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে এবং জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।
- অন্ত্রে বাধা (Intestinal Obstruction): শিশুর— বমি হতে পারে, পেট ফুলে যেতে পারে এবং পায়খানা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
- অণ্ডকোষের ক্ষতি: দীর্ঘ সময় রক্ত চলাচল ব্যাহত হলে অণ্ডকোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
- জটিল অপারেশনের প্রয়োজন: সময়মতো পরিকল্পিত অপারেশনের পরিবর্তে জরুরি ও তুলনামূলক জটিল অস্ত্রোপচার করতে হতে পারে।
এটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনগুইনাল হার্নিয়া শুধুমাত্র শিশুর ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা (Clinical Examination) করেই নির্ণয় করা যায়।
আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) কি সবসময় দরকার? উত্তর হলো “না”।
অনেক অভিভাবক মনে করেন আল্ট্রাসনোগ্রাফি ছাড়া হার্নিয়া ধরা যায় না। বাস্তবে, অভিজ্ঞ শিশু সার্জনের শারীরিক পরীক্ষাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন হতে পারে, যেমন—
- ফোলাটি সবসময় দেখা না গেলে
- হার্নিয়া ও হাইড্রোসিলের মধ্যে পার্থক্য করা কঠিন হলে
- মেয়ে শিশুর কুঁচকিতে ফোলা থাকলে
- অন্য কোনো রোগের সন্দেহ থাকলে
ইনগুইনাল হার্নিয়ার চিকিৎসা কী?
ইনগুইনাল হার্নিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো অপারেশন।
ওষুধে কি হার্নিয়া ভালো হয়?
উত্তর হলো “না”। কোনো ওষুধ, সিরাপ, ব্যায়াম বা মালিশ করে হার্নিয়া ভালো হয় না।
হার্নিয়া বেল্ট বা বেল্ট ব্যবহার করা উচিত?
না। শিশুদের ক্ষেত্রে হার্নিয়া বেল্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয় না। এতে রোগ সারে না এবং কখনও কখনও জটিলতা বাড়তে পারে।
কখন অপারেশন করা উচিত?
রোগ নির্ণয় হওয়ার পর সাধারণত যত দ্রুত সুবিধাজনক সময়ে সম্ভব অপারেশন করা উচিত। কারণ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার (Incarceration) ঝুঁকি বাড়ে।
অপারেশন সম্পর্কে বিস্তারিত
অনেক অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— “এত ছোট বাচ্চার অপারেশন কি নিরাপদ?” উত্তর হলো—হ্যাঁ।
বর্তমানে শিশুদের জন্য আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া ও সার্জিক্যাল প্রযুক্তির কারণে ইনগুইনাল হার্নিয়ার অপারেশন অত্যন্ত নিরাপদ এবং সফল।
অপারেশনের নাম কি এবং কি কি উপায়ে করা যায়?
হার্নিয়ার অপারেশনের নাম “হার্নিয়োটমি”। এটা ছোট্ট একটু কেটে (open) অথবা পেটে ছোট্ট ১/২/৩ টি ছিদ্র করে (laparoscopy) করা যায়। ল্যাপারোস্কোপি হচ্ছে আধুনিকতর চিকিৎসা পদ্ধতি।
Open অপারেশনে কি করা হয়?
- কুঁচকির একটি ছোট কাটা দেওয়া হয়
- খোলা থাকা পথটি বন্ধ করে দেওয়া হয়
- অন্ত্রকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়
অপারেশন কতক্ষণ লাগে?
সাধারণত ৩০–৬০ মিনিট।
অজ্ঞান করা কি নিরাপদ?
অভিজ্ঞ শিশু অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া অত্যন্ত নিরাপদ।
শিশুকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হয়?
বেশিরভাগ শিশু একই দিন বা পরদিন বাড়ি যেতে পারে।


অপারেশনের পরে শিশুর যত্ন
অপারেশনের পর সঠিক যত্ন নিলে শিশুর সুস্থ হতে সুবিধা হয়।
খাবারঃ
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবার শুরু করা যায়।
গোসলঃ
ক্ষত শুকানো পর্যন্ত চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
ব্যথাঃ
- কিছুটা ব্যথা বা অস্বস্তি স্বাভাবিক।
- নির্ধারিত ব্যথার ওষুধ সময়মতো দিন।
ক্ষতের যত্নঃ
- ক্ষত পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
- নিজে থেকে ব্যান্ডেজ খুলবেন না, যদি না চিকিৎসক নির্দেশ দেন।
খেলাধুলাঃ
- কয়েকদিন ভারী খেলাধুলা এড়িয়ে চলা ভালো।
- ছোট শিশুরা সাধারণত খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যায়।
প্রচলিত ভুল ধারণা (মিথ বনাম সত্য)
❌ মিথ ১: হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়।
✅ সত্য: শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া সাধারণত নিজে নিজে ভালো হয় না।
❌ মিথ ২: মালিশ করলে হার্নিয়া সেরে যায়।
✅ সত্য: মালিশে হার্নিয়া ভালো হয় না, বরং ক্ষতি হতে পারে।
❌ মিথ ৩: অপারেশন করলে শিশু দুর্বল হয়ে যাবে।
✅ সত্য: সফল অপারেশনের পর অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে।
❌ মিথ ৪: যত বড় হবে তত অপেক্ষা করা ভালো।
✅ সত্য: অযথা দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
❌ মিথ ৫: হার্নিয়া হলে সবসময় ব্যথা থাকবে।
✅ সত্য: অনেক শিশুর কোনো ব্যথাই থাকে না।
অভিভাবকদের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ)
১। হার্নিয়া কি ওষুধে ভালো হয়? > না।
২। অপারেশন কি খুব ব্যথার? > আধুনিক ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ব্যথা অনেক কম থাকে।
৩। অপারেশনের পর আবার হার্নিয়া হতে পারে? > সফল অপারেশনের পর পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।
৪। দুই পাশেই কি হার্নিয়া হতে পারে? > হ্যাঁ।
৫। অপারেশনের জন্য কি রক্ত লাগে? > না।
৬। অপারেশনের পর সেলাই কাটতে হয়? > না। বর্তমানে এমন সেলাই ব্যবহার করা হয় যা নিজে থেকেই গলে যায়।
৭। আবার কি একই জায়গায় হতে পারে? > পারে, তবে অত্যন্ত বিরল।
৮। হার্নিয়া কি জরুরি অপারেশন? > সবসময় নয়। তবে হার্নিয়া আটকে গেলে জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে।
সংক্ষেপে মনে রাখুন
✔ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি সাধারণ রোগ।
✔ এটি নিজে নিজে ভালো হয় না।
✔ ওষুধ বা মালিশে এটি সারে না।
✔ সময়মতো অপারেশনই স্থায়ী চিকিৎসা।
✔ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে গিয়ে জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে।
✔ দ্রুত চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে।
শিশু সার্জন ডা. প্রসেনজিৎ দত্তের পরামর্শ
একজন শিশু সার্জন হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়, অনেক অভিভাবক প্রথমে কুঁচকির ফোলাকে গুরুত্ব দেন না, কারণ শিশুর কান্না থামলে ফোলাটিও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এটি নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
আপনার শিশুর কুঁচকিতে যদি বারবার ফোলা দেখা যায়, বিশেষ করে কান্না বা কাশি দিলে, তাহলে দেরি না করে একজন শিশু সার্জনের পরামর্শ নিন। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও পরিকল্পিত চিকিৎসা অধিকাংশ জটিলতা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে।
লেখক পরিচিতি
ডা. প্রসেনজিৎ দত্ত
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)
এমএস (শিশু সার্জারি)
শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ডা. প্রসেনজিৎ দত্ত নবজাতক, শিশু ও কিশোরদের বিভিন্ন জন্মগত ও অর্জিত অস্ত্রোপচারজনিত রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত। তাঁর বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ইনগুইনাল হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, অণ্ডকোষ না নামা (Undescended Testis), নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি, শিশুদের ইউরোলজিক্যাল সমস্যা এবং মিনিমালি ইনভেসিভ (ল্যাপারোস্কোপিক) শিশু সার্জারি। তিনি শিশু হার্নিয়ার অপারেশনে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ।