Dr. Prosenjit Datta

আগস্ট 10, 2026

Uncategorized

শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia in Children): লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা

আপনার শিশুর কুঁচকিতে (Groin) বা অণ্ডকোষের কাছে হঠাৎ কোনো ফোলা অংশ দেখে ভয় পাচ্ছেন? বাবা-মা হিসেবে এমন দৃশ্য দেখে দুশ্চিন্তা হওয়াটাই খুব স্বাভাবিক। তবে আশার কথা হলো, শিশুদের কুঁচকির হার্নিয়া (Inguinal Hernia) একটি অত্যন্ত সাধারণ সমস্যা এবং সঠিক সময়ে একজন পেডিয়াট্রিক সার্জনের চিকিৎসায় এটি সম্পূর্ণ ও নিরাপদে নিরাময়যোগ্য। চলুন জেনে নিই এই সমস্যাটি কেন হয় এবং কখন আপনার সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ✅ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি অত্যন্ত সাধারণ অস্ত্রোপচারজনিত রোগ। ✅ ছেলে শিশুদের মধ্যে এটি মেয়ে শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। ✅ হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না। ✅ সময়মতো অপারেশন করলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যায়। ✅ হার্নিয়া আটকে গেলে এটি জরুরি অবস্থা হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। ইনগুইনাল হার্নিয়া কি? ইনগুইনাল হার্নিয়া (Inguinal Hernia) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পেটের ভেতরের কোনো অংশ—সাধারণত অন্ত্রের একটি অংশ—পেটের দেয়ালের একটি দুর্বল বা খোলা পথ দিয়ে কুঁচকির দিকে বেরিয়ে আসে। শিশুর কান্না, কাশি, হাসি বা চাপ দেওয়ার সময় এই ফোলা আরও স্পষ্ট দেখা যায়। অনেক সময় শিশুটি শান্ত হয়ে গেলে বা ঘুমিয়ে পড়লে ফোলাটি আবার নিজে থেকেই ভেতরে চলে যায়। এই কারণেই অনেক অভিভাবক প্রথমে বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু মনে রাখতে হবে, হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয় না। কেন ইনগুইনাল হার্নিয়া হয়? শিশুর শরীর মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় ছেলে শিশুর অণ্ডকোষ (Testis) পেটের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে অণ্ডথলিতে নেমে আসে। এই নামার সময় একটি ছোট পথ (Processus Vaginalis) তৈরি হয়। স্বাভাবিকভাবে জন্মের আগে বা জন্মের কিছুদিনের মধ্যে এই পথটি বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু যদি এটি পুরোপুরি বন্ধ না হয়, তাহলে সেই পথ দিয়ে অন্ত্র বা পেটের অন্যান্য অংশ নিচে নেমে এসে হার্নিয়া তৈরি করতে পারে। মেয়ে শিশুদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের একটি জন্মগত পথ খোলা থাকলে ইনগুইনাল হার্নিয়া হতে পারে। অর্থাৎ অধিকাংশ শিশুর ইনগুইনাল হার্নিয়া জন্মগত (Congenital)। ইনগুইনাল হার্নিয়ার লক্ষণ কি? বাবা-মায়েরা সাধারণত শিশুর গোসল করানো বা ডায়াপার পরানোর সময় এই সমস্যাটি প্রথম খেয়াল করেন। এর প্রধান লক্ষণগুলো হলো: বিপজ্জনক লক্ষণ (Danger Signs) কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন? চিকিৎসা না করলে কী কী জটিলতা হতে পারে? অনেকেই ভাবেন— “বাচ্চা একটু বড় হলে দেখবো।” এটি সবসময় নিরাপদ সিদ্ধান্ত নয়। চিকিৎসা না করলে হতে পারে— এটি কীভাবে নির্ণয় করা হয়? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ইনগুইনাল হার্নিয়া শুধুমাত্র শিশুর ইতিহাস এবং শারীরিক পরীক্ষা (Clinical Examination) করেই নির্ণয় করা যায়। আল্ট্রাসনোগ্রাফি (Ultrasonography) কি সবসময় দরকার? উত্তর হলো “না”। অনেক অভিভাবক মনে করেন আল্ট্রাসনোগ্রাফি ছাড়া হার্নিয়া ধরা যায় না। বাস্তবে, অভিজ্ঞ শিশু সার্জনের শারীরিক পরীক্ষাই অধিকাংশ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। তবে কিছু বিশেষ পরিস্থিতিতে আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রয়োজন হতে পারে, যেমন— ইনগুইনাল হার্নিয়ার চিকিৎসা কী? ইনগুইনাল হার্নিয়ার স্থায়ী চিকিৎসা হলো অপারেশন। ওষুধে কি হার্নিয়া ভালো হয়? উত্তর হলো “না”। কোনো ওষুধ, সিরাপ, ব্যায়াম বা মালিশ করে হার্নিয়া ভালো হয় না। হার্নিয়া বেল্ট বা বেল্ট ব্যবহার করা উচিত? না। শিশুদের ক্ষেত্রে হার্নিয়া বেল্ট ব্যবহার করার পরামর্শ দেওয়া হয় না। এতে রোগ সারে না এবং কখনও কখনও জটিলতা বাড়তে পারে। কখন অপারেশন করা উচিত? রোগ নির্ণয় হওয়ার পর সাধারণত যত দ্রুত সুবিধাজনক সময়ে সম্ভব অপারেশন করা উচিত। কারণ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার (Incarceration) ঝুঁকি বাড়ে। অপারেশন সম্পর্কে বিস্তারিত অনেক অভিভাবকের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন— “এত ছোট বাচ্চার অপারেশন কি নিরাপদ?” উত্তর হলো—হ্যাঁ। বর্তমানে শিশুদের জন্য আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া ও সার্জিক্যাল প্রযুক্তির কারণে ইনগুইনাল হার্নিয়ার অপারেশন অত্যন্ত নিরাপদ এবং সফল। অপারেশনের নাম কি এবং কি কি উপায়ে করা যায়? হার্নিয়ার অপারেশনের নাম “হার্নিয়োটমি”। এটা ছোট্ট একটু কেটে (open) অথবা পেটে ছোট্ট ১/২/৩ টি ছিদ্র করে (laparoscopy) করা যায়। ল্যাপারোস্কোপি হচ্ছে আধুনিকতর চিকিৎসা পদ্ধতি। Open অপারেশনে কি করা হয়? অপারেশন কতক্ষণ লাগে? সাধারণত ৩০–৬০ মিনিট। অজ্ঞান করা কি নিরাপদ? অভিজ্ঞ শিশু অ্যানেস্থেসিয়া বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে আধুনিক অ্যানেস্থেসিয়া অত্যন্ত নিরাপদ। শিশুকে কতদিন হাসপাতালে থাকতে হয়? বেশিরভাগ শিশু একই দিন বা পরদিন বাড়ি যেতে পারে। অপারেশনের পরে শিশুর যত্ন অপারেশনের পর সঠিক যত্ন নিলে শিশুর সুস্থ হতে সুবিধা হয়। খাবারঃ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে স্বাভাবিক খাবার শুরু করা যায়। গোসলঃ ক্ষত শুকানো পর্যন্ত চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করুন। ব্যথাঃ ক্ষতের যত্নঃ খেলাধুলাঃ প্রচলিত ভুল ধারণা (মিথ বনাম সত্য) ❌ মিথ ১: হার্নিয়া নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়। ✅ সত্য: শিশুদের ইনগুইনাল হার্নিয়া সাধারণত নিজে নিজে ভালো হয় না। ❌ মিথ ২: মালিশ করলে হার্নিয়া সেরে যায়। ✅ সত্য: মালিশে হার্নিয়া ভালো হয় না, বরং ক্ষতি হতে পারে। ❌ মিথ ৩: অপারেশন করলে শিশু দুর্বল হয়ে যাবে। ✅ সত্য: সফল অপারেশনের পর অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করে। ❌ মিথ ৪: যত বড় হবে তত অপেক্ষা করা ভালো। ✅ সত্য: অযথা দেরি করলে হার্নিয়া আটকে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। ❌ মিথ ৫: হার্নিয়া হলে সবসময় ব্যথা থাকবে। ✅ সত্য: অনেক শিশুর কোনো ব্যথাই থাকে না। অভিভাবকদের সাধারণ প্রশ্ন (FAQ) ১। হার্নিয়া কি ওষুধে ভালো হয়? > না। ২। অপারেশন কি খুব ব্যথার? > আধুনিক ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে ব্যথা অনেক কম থাকে। ৩। অপারেশনের পর আবার হার্নিয়া হতে পারে? > সফল অপারেশনের পর পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। ৪। দুই পাশেই কি হার্নিয়া হতে পারে? > হ্যাঁ। ৫। অপারেশনের জন্য কি রক্ত লাগে? > না। ৬। অপারেশনের পর সেলাই কাটতে হয়? > না। বর্তমানে এমন সেলাই ব্যবহার করা হয় যা নিজে থেকেই গলে যায়। ৭। আবার কি একই জায়গায় হতে পারে? > পারে, তবে অত্যন্ত বিরল। ৮। হার্নিয়া কি জরুরি অপারেশন? > সবসময় নয়। তবে হার্নিয়া আটকে গেলে জরুরি অপারেশন প্রয়োজন হতে পারে। সংক্ষেপে মনে রাখুন ✔ ইনগুইনাল হার্নিয়া শিশুদের একটি সাধারণ রোগ। ✔ এটি নিজে নিজে ভালো হয় না। ✔ ওষুধ বা মালিশে এটি সারে না। ✔ সময়মতো অপারেশনই স্থায়ী চিকিৎসা। ✔ দেরি করলে হার্নিয়া আটকে গিয়ে জরুরি অবস্থা তৈরি হতে পারে। ✔ দ্রুত চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে। শিশু সার্জন ডা. প্রসেনজিৎ দত্তের পরামর্শ একজন শিশু সার্জন হিসেবে আমার অভিজ্ঞতায়, অনেক অভিভাবক প্রথমে কুঁচকির ফোলাকে গুরুত্ব দেন না, কারণ শিশুর কান্না থামলে ফোলাটিও অনেক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। কিন্তু এটি নিরাপদ বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আপনার শিশুর কুঁচকিতে যদি বারবার ফোলা দেখা যায়, বিশেষ করে কান্না বা কাশি দিলে, তাহলে দেরি না করে একজন শিশু সার্জনের পরামর্শ নিন। সময়মতো রোগ নির্ণয় ও পরিকল্পিত চিকিৎসা অধিকাংশ জটিলতা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে। লেখক পরিচিতি ডা. প্রসেনজিৎ দত্তএমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য)এমএস (শিশু সার্জারি) শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ডা. প্রসেনজিৎ দত্ত নবজাতক, শিশু ও কিশোরদের বিভিন্ন জন্মগত ও অর্জিত অস্ত্রোপচারজনিত রোগের চিকিৎসায় নিয়োজিত। তাঁর বিশেষ আগ্রহের ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে ইনগুইনাল হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, অণ্ডকোষ না নামা (Undescended Testis), নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি, শিশুদের ইউরোলজিক্যাল সমস্যা এবং মিনিমালি ইনভেসিভ (ল্যাপারোস্কোপিক) শিশু সার্জারি। তিনি শিশু হার্নিয়ার অপারেশনে বিশেষভাবে অভিজ্ঞ ও দক্ষ।

A family gathering is happening on the occasion of a circumcision ceremony of the youngest male memeber of the family
Awareness

শিশুদের নিরাপদ খতনা (Safe Circumcision) এবং ফাইমোসিস (Phimosis): লক্ষণ, কারণ এবং সঠিক চিকিৎসা

সুন্নতে খাৎনা বা সারকামসিশন আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত একটি বিষয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খতনা ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে করা হলেও কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণেও খতনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মনে খতনা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকে— এই লেখায় শিশুদের খতনা সম্পর্কে অভিভাবকদের জানা প্রয়োজন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো। খাৎনা (Circumcision) আসলে কি? সহজ ভাষায় বলতে গেলে, খতনা বা Circumcision হলো পুরুষ শিশুর লিঙ্গের মাথা (Glans Penis) ঢেকে রাখা অতিরিক্ত চামড়া বা Foreskin/Prepuce-এর একটি অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা। এই চামড়াটি পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশকে (Glans) ঢেকে রাখে। অনেক বাবা-মা মনে করেন এটি হয়তো একটি সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার বিষয়, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই এটি করানো যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্জারি। ফাইমোসিস (Phimosis) কি ? ফাইমোসিস (Phimosis) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষাঙ্গের সামনের দিকের চামড়াটি অতিরিক্ত টাইট বা সংকুচিত থাকে, যার ফলে চামড়াটি পেছনের দিকে টানা যায় না। শিশুদের জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ঠিক না হলে বা প্রস্রাবে সমস্যা তৈরি করলে তখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। ছবিঃ ফাইমোসিস ও প্যারাফিমোসিস লক্ষণ ও উপসর্গ (Signs and Symptoms) খতনা সাধারণত সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিন হিসেবে করা হয়। তবে যদি আপনার শিশুর ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখতে পারেন: খতনা কতটা সাধারণ? খতনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-প্রধান দেশে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে খতনা শুধু ধর্মীয় প্রথা নয়—এটি একটি সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। তাই কোথায়, কখন এবং কার মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে—এসব বিষয় শিশুর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জনের মাধ্যমে এখন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত ও নিরাপদে শিশুর খতনা করানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই কখন এবং কেন শিশুর খতনা করানো জরুরি। কেন খতনা করা হয়? খতনা করার কারণকে সাধারণভাবে তিন ভাগে দেখা যায়। ১. ধর্মীয় কারণ বাংলাদেশে ছেলে শিশুর খতনার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি। ২. সামাজিক বা ব্যক্তিগত কারণ কিছু পরিবার ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে খতনা করানোর সিদ্ধান্ত নেন। ৩. চিকিৎসাগত কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণে খতনা প্রয়োজন হতে পারে। যেমন— কোন বয়সে খতনা করা ভালো? এটি অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। খতনার জন্য সবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট “সেরা বয়স” নেই। খতনার উপযুক্ত সময় নির্ভর করে— নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থানীয় অবেদন (Local Anaesthesia) ব্যবহার করে খতনা করা সম্ভব হতে পারে। বড় শিশুর ক্ষেত্রে শিশুর সহযোগিতা, ভয় এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যানেস্থেসিয়ার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে। তাই “অমুক বয়সেই খতনা করতেই হবে”—এমন কোনো একক নিয়ম নেই। খতনার আগে শিশুকে কি পরীক্ষা করতে হয়? সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে খতনার আগে চিকিৎসক শিশুকে পরীক্ষা করে দেখবেন— রক্ত পরীক্ষা কি সব শিশুর জন্য দরকার? স্বাভাবিকভাবে সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিনভাবে সব ধরনের রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে শিশুর অতিরিক্ত রক্তপাতের ইতিহাস, রক্তক্ষরণজনিত রোগের পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। তবে ঝুঁকি এড়াতে সাধারণত কিছু রুটিন পরীক্ষা করে নেওয়া উচিৎ। যেমন – কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে খতনা করার আগে বিশেষ সতর্কতা দরকার? কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সরাসরি খতনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে— লিঙ্গের অন্য কোনো জন্মগত অস্বাভাবিকতা থাকলেও আগে শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অস্ত্রোপচারে foreskin-এর চামড়া প্রয়োজন হতে পারে। তাই শিশুর লিঙ্গের গঠন অস্বাভাবিক মনে হলে আগে শিশু সার্জনকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে তারপর খতনার সিদ্ধান্ত নিন। ছবিঃ হাইপোসপেডিয়াস – সাধারণভাবে খৎনা করা যেখানে উচিৎ নয়। খতনায় কি ধরনের Anesthesia (অবেদন) ব্যবহার করা হয় ? খতনার সময় চিকিৎসক শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের যেকোন একটি anesthesia ব্যবহার করতে পারেন — ছবিঃ Local Anesthesia VS General Anesthesi – দুইটাই সেইফ পদ্ধতি। শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা হয় কোনটা বেটার হবে। খতনার পরে কি ব্যাথা হয় ? হ্যাঁ, ব্যথা হতে পারে, কারণ খতনা একটি অস্ত্রোপচার। তবে যথাযথ ব্যথানিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশুর অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় খতনার সময় কার্যকর ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “বাচ্চা ছোট, তাই ব্যথা বুঝবে না”—এই ধারণা ভুল। শিশুর ব্যথা অনুভূতি আছে এবং খতনার সময় যথাযথ pain relief দেওয়া উচিত। খতনার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জটিলতা কি কি ? যদিও খতনা সাধারণত নিরাপদ একটি ছোট অস্ত্রোপচার, তবুও অন্য যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে- সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এবং যথাযথ pain control ব্যবহার করে করলে গুরুতর জটিলতা বিরল। ছবিঃ দূর্ভাগ্যজনক কিন্ত বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা। “হাজাম”-নামক বিভীসিকার শিকার কিছু কমলমতি বালক। ভিডিওঃ আপনি যদি অভিভাবক হন তাহলে কাকে দায়ী করবেন এর জন্য? এই শিশুকে, ‘হাজাম’-কে, নাকি নিজেকে? খতনা কীভাবে করা হয় ? খতনার বিভিন্ন surgical technique রয়েছে। পদ্ধতি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং সার্জনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে – খতনার কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো ? অভিভাবকরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন— “কোন ডিভাইস/পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো?”বাস্তবে একটি পদ্ধতি সব শিশুর জন্য সেরা নয়। বিভিন্ন বয়স ও পরিস্থিতিতে বিভিন্ন surgical technique বা device ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিশু সার্জন বাচ্চার সকল বিষয় বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিটি নির্বাচন করেন। শুধু “দ্রুত” বা “কম খরচে” হওয়াই ভালো খতনার মাপকাঠি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো— প্রশিক্ষিত চিকিৎসক + সঠিক রোগী নির্বাচন + জীবাণুমুক্ত পরিবেশ + যথাযথ ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ + সঠিক ফলো-আপ। অপারেশনের পর শিশুর কী কী স্বাভাবিক লক্ষণ হতে পারে? খতনার পর কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক। যেমন – এসব সাধারণত ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে রক্তপাত বন্ধ না হলে, প্রস্রাব না হলে বা জ্বর/পুঁজ হলে তা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়। খতনার পর শিশুর যত্ন কীভাবে করবেন? খতনার পর কতদিনে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়? সুস্থ হতে শিশুভেদে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। সাধারণভাবে— খতনার পর কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন? নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন— 🚨 রক্তপাত বন্ধ না হওয়া 🚨 বারবার বা বেশি পরিমাণে রক্ত পড়া 🚨 শিশুর প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাব করতে খুব কষ্ট হওয়া 🚨 অতিরিক্ত ফোলা 🚨 পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া 🚨 জ্বর 🚨 ক্ষত খুলে যাওয়া 🚨 ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকা 🚨 লিঙ্গের মাথার রং অস্বাভাবিকভাবে কালচে/নীলচে হয়ে যাওয়া খতনা কি ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা তৈরি করে? সঠিকভাবে এবং যথাযথ surgical technique ব্যবহার করে খতনা করা হলে অধিকাংশ শিশুর দীর্ঘমেয়াদে কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয়না।তবে ভুল পদ্ধতি, অনভিজ্ঞ হাতে করা, অতিরিক্ত চামড়া কেটে ফেলা, সংক্রমণ বা ক্ষতজনিত সমস্যার কারণে কিছু শিশুরপরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তাই—খতনা ছোট অপারেশন হলেও “যে কেউ করলেই হবে”—এমন একটি প্রক্রিয়া নয়। সেজন্য শিশুর নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। প্রচলিত ভুল ধারণা — মিথ বনাম সত্য ❌ মিথ ১: ছোট বাচ্চার ব্যথা লাগে না। ✅ সত্য: শিশুরা ব্যথা অনুভব করে। তাই যথাযথ ব্যথা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ❌ মিথ ২: খতনার আগে কোনো পরীক্ষা বা ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই। ✅ সত্য: শিশুর লিঙ্গের গঠন, শারীরিক অবস্থা এবং bleeding history সম্পর্কে নিশ্চিত

Scroll to Top