
সুন্নতে খাৎনা বা সারকামসিশন আমাদের সমাজে অত্যন্ত পরিচিত একটি বিষয়। বাংলাদেশে অধিকাংশ ক্ষেত্রে খতনা ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে করা হলেও কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণেও খতনা প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু অনেক অভিভাবকের মনে খতনা নিয়ে নানা প্রশ্ন থাকে—
- কোন বয়সে খতনা করা ভালো?
- খতনার আগে কি কোনো পরীক্ষা দরকার?
- খতনা কি ব্যথাদায়ক?
- অ্যানেস্থেসিয়া কি নিরাপদ?
- কোন পদ্ধতিতে খতনা করা ভালো?
এই লেখায় শিশুদের খতনা সম্পর্কে অভিভাবকদের জানা প্রয়োজন এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সহজ ভাষায় আলোচনা করা হলো।

খাৎনা (Circumcision) আসলে কি?
সহজ ভাষায় বলতে গেলে, খতনা বা Circumcision হলো পুরুষ শিশুর লিঙ্গের মাথা (Glans Penis) ঢেকে রাখা অতিরিক্ত চামড়া বা Foreskin/Prepuce-এর একটি অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ করা। এই চামড়াটি পুরুষাঙ্গের সংবেদনশীল অংশকে (Glans) ঢেকে রাখে। অনেক বাবা-মা মনে করেন এটি হয়তো একটি সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার বিষয়, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই এটি করানো যায়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এটি একটি পূর্ণাঙ্গ সার্জারি।
ফাইমোসিস (Phimosis) কি ?
ফাইমোসিস (Phimosis) হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে পুরুষাঙ্গের সামনের দিকের চামড়াটি অতিরিক্ত টাইট বা সংকুচিত থাকে, যার ফলে চামড়াটি পেছনের দিকে টানা যায় না। শিশুদের জন্মের পর এটি স্বাভাবিক হতে পারে, তবে বয়স বাড়ার সাথে সাথে এটি ঠিক না হলে বা প্রস্রাবে সমস্যা তৈরি করলে তখন চিকিৎসার প্রয়োজন হয়।


ছবিঃ ফাইমোসিস ও প্যারাফিমোসিস
লক্ষণ ও উপসর্গ (Signs and Symptoms)
খতনা সাধারণত সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিন হিসেবে করা হয়। তবে যদি আপনার শিশুর ফাইমোসিস বা প্রস্রাবের রাস্তায় কোনো সমস্যা থাকে, তবে নিচের লক্ষণগুলো দেখতে পারেন:
- প্রস্রাব করার সময় পুরুষাঙ্গের সামনের চামড়াটি বেলুনের মতো ফুলে ওঠে (Ballooning of foreskin)।
- শিশু প্রস্রাব করার সময় কান্না করে বা ব্যথা পায়।
- প্রস্রাব একটানা না হয়ে ফোঁটায় ফোঁটায় বা আঁকাবাঁকা হয়ে পড়ে।
- পুরুষাঙ্গের মাথায় বারবার লালচে ভাব, চুলকানি বা ইনফেকশন দেখা যায় (যাকে Balanitis বলা হয়)।
খতনা কতটা সাধারণ?
খতনা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত। বাংলাদেশসহ অনেক মুসলিম-প্রধান দেশে এটি ধর্মীয় ও সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে খতনা শুধু ধর্মীয় প্রথা নয়—এটি একটি সার্জিক্যাল প্রক্রিয়া। তাই কোথায়, কখন এবং কার মাধ্যমে এটি করা হচ্ছে—এসব বিষয় শিশুর নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের কল্যাণে একজন বিশেষজ্ঞ পেডিয়াট্রিক সার্জনের মাধ্যমে এখন সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত ও নিরাপদে শিশুর খতনা করানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই কখন এবং কেন শিশুর খতনা করানো জরুরি।
কেন খতনা করা হয়?
খতনা করার কারণকে সাধারণভাবে তিন ভাগে দেখা যায়।
১. ধর্মীয় কারণ
বাংলাদেশে ছেলে শিশুর খতনার সবচেয়ে প্রচলিত কারণগুলোর একটি।
২. সামাজিক বা ব্যক্তিগত কারণ
কিছু পরিবার ব্যক্তিগত বা সামাজিক কারণে খতনা করানোর সিদ্ধান্ত নেন।
৩. চিকিৎসাগত কারণ
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণে খতনা প্রয়োজন হতে পারে।
যেমন—
- বারবার Balanitis বা লিঙ্গের মাথায় সংক্রমণ
- সমস্যাজনক Phimosis
- foreskin-এর দাগ বা শক্ত হয়ে যাওয়া
- বারবার foreskin সংক্রান্ত সমস্যা
- কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাবের সমস্যা
কোন বয়সে খতনা করা ভালো?
এটি অভিভাবকদের সবচেয়ে সাধারণ প্রশ্নগুলোর একটি। খতনার জন্য সবার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট “সেরা বয়স” নেই।
খতনার উপযুক্ত সময় নির্ভর করে—
- শিশুর বয়স
- শারীরিক অবস্থা
- লিঙ্গাঙ্গের গঠন
- কোনো জন্মগত সমস্যা আছে কি না
- কোন ধরনের অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োজন
- কোন পদ্ধতিতে খতনা করা হবে
- শিশুর ও পরিবারের সুবিধা
নবজাতক বা খুব ছোট শিশুর ক্ষেত্রে কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে স্থানীয় অবেদন (Local Anaesthesia) ব্যবহার করে খতনা করা সম্ভব হতে পারে। বড় শিশুর ক্ষেত্রে শিশুর সহযোগিতা, ভয় এবং নড়াচড়া নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিবেচনা করে অ্যানেস্থেসিয়ার পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে।
তাই “অমুক বয়সেই খতনা করতেই হবে”—এমন কোনো একক নিয়ম নেই।
খতনার আগে শিশুকে কি পরীক্ষা করতে হয়?
সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে সাধারণত বিস্তারিত পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। তবে খতনার আগে চিকিৎসক শিশুকে পরীক্ষা করে দেখবেন—
- শিশুটি সুস্থ কি না
- জ্বর বা কোনো সক্রিয় সংক্রমণ আছে কি না
- লিঙ্গের গঠন স্বাভাবিক কি না
- Foreskin-এর অবস্থা
- Hypospadias আছে কি না
- Chordee বা লিঙ্গের অস্বাভাবিক বাঁক আছে কি না
- Buried বা Concealed Penis আছে কি না
- অণ্ডকোষ স্বাভাবিকভাবে আছে কি না
- অতিরিক্ত রক্তপাতের কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ইতিহাস আছে কি না
রক্ত পরীক্ষা কি সব শিশুর জন্য দরকার?
স্বাভাবিকভাবে সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে রুটিনভাবে সব ধরনের রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে শিশুর অতিরিক্ত রক্তপাতের ইতিহাস, রক্তক্ষরণজনিত রোগের পারিবারিক ইতিহাস বা অন্য কোনো সন্দেহ থাকলে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন।
তবে ঝুঁকি এড়াতে সাধারণত কিছু রুটিন পরীক্ষা করে নেওয়া উচিৎ। যেমন –
- Complete Blood Count
- S. Creatinine
- BT, PT & APTT
- Xray Chest
কোন কোন শিশুর ক্ষেত্রে খতনা করার আগে বিশেষ সতর্কতা দরকার?
কিছু শিশুর ক্ষেত্রে সরাসরি খতনা করা উচিত নয়। বিশেষ করে—
- হাইপোসপেডিয়াস – যেখানে প্রস্রাবের ছিদ্র লিঙ্গের একেবারে আগায় না থেকে নিচের দিকে থাকে।
- Chordee – লিঙ্গ অস্বাভাবিকভাবে নিচের দিকে বা অন্যদিকে বাঁকা থাকতে পারে।
- Buried/Concealed Penis – লিঙ্গের আকার স্বাভাবিক হলেও আশপাশের চামড়া বা টিস্যুর কারণে লিঙ্গটি বাইরে যথেষ্ট বের হয়ে না আসতে পারে।
- Penile abnormalities
লিঙ্গের অন্য কোনো জন্মগত অস্বাভাবিকতা থাকলেও আগে শিশু সার্জনের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। কারণ কিছু শিশুর ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ অস্ত্রোপচারে foreskin-এর চামড়া প্রয়োজন হতে পারে।
তাই শিশুর লিঙ্গের গঠন অস্বাভাবিক মনে হলে আগে শিশু সার্জনকে দিয়ে পরীক্ষা করিয়ে তারপর খতনার সিদ্ধান্ত নিন।


ছবিঃ হাইপোসপেডিয়াস – সাধারণভাবে খৎনা করা যেখানে উচিৎ নয়।
খতনায় কি ধরনের Anesthesia (অবেদন) ব্যবহার করা হয় ?
খতনার সময় চিকিৎসক শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী নিচের যেকোন একটি anesthesia ব্যবহার করতে পারেন —
- General Anesthesia (সম্পূর্ণ অজ্ঞান)
- Regional/Nerve Block (নার্ভ ব্লক)
- Local Anesthesia (নির্দিষ্ট জায়গায় অবশ করে)


ছবিঃ Local Anesthesia VS General Anesthesi – দুইটাই সেইফ পদ্ধতি। শিশুর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ঠিক করা হয় কোনটা বেটার হবে।
খতনার পরে কি ব্যাথা হয় ?
হ্যাঁ, ব্যথা হতে পারে, কারণ খতনা একটি অস্ত্রোপচার। তবে যথাযথ ব্যথানিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে শিশুর অস্বস্তি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো যায়। আন্তর্জাতিক নির্দেশনায় খতনার সময় কার্যকর ব্যথানিয়ন্ত্রণ ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় “বাচ্চা ছোট, তাই ব্যথা বুঝবে না”—এই ধারণা ভুল।
শিশুর ব্যথা অনুভূতি আছে এবং খতনার সময় যথাযথ pain relief দেওয়া উচিত।
খতনার সম্ভাব্য ঝুঁকি ও জটিলতা কি কি ?
যদিও খতনা সাধারণত নিরাপদ একটি ছোট অস্ত্রোপচার, তবুও অন্য যেকোনো অস্ত্রোপচারের মতো এরও কিছু ঝুঁকি রয়েছে।সম্ভাব্য জটিলতার মধ্যে রয়েছে-
- রক্তপাত – সবচেয়ে পরিচিত জটিলতাগুলোর একটি।
- সংক্রমণ – ক্ষতস্থানে সংক্রমণ হতে পারে।
- অতিরিক্ত চামড়া বা কম চামড়া অপসারণ – সার্জিক্যাল কৌশল ও অভিজ্ঞতার ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে।
- ক্ষত ঠিকভাবে না শুকানো – কিছু ক্ষেত্রে healing দেরি হতে পারে।
- প্রস্রাবের সমস্যা – অত্যন্ত বিরল ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে urethral সমস্যা হতে পারে।
- Cosmetic সমস্যা – কিছু ক্ষেত্রে চামড়া অসমভাবে সেরে যেতে পারে বা অতিরিক্ত skin adhesion তৈরি হতে পারে।
সঠিকভাবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের মাধ্যমে, জীবাণুমুক্ত পরিবেশে এবং যথাযথ pain control ব্যবহার করে করলে গুরুতর জটিলতা বিরল।





ছবিঃ দূর্ভাগ্যজনক কিন্ত বাংলাদেশের নির্মম বাস্তবতা। “হাজাম”-নামক বিভীসিকার শিকার কিছু কমলমতি বালক।
ভিডিওঃ আপনি যদি অভিভাবক হন তাহলে কাকে দায়ী করবেন এর জন্য? এই শিশুকে, ‘হাজাম’-কে, নাকি নিজেকে?
খতনা কীভাবে করা হয় ?
খতনার বিভিন্ন surgical technique রয়েছে। পদ্ধতি শিশুর বয়স, শারীরিক গঠন এবং সার্জনের অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে –
- ধাপ ১: শিশুকে পরীক্ষা করা – প্রথমে লিঙ্গের গঠন পরীক্ষা করা হয়।
- ধাপ ২: ব্যথানিয়ন্ত্রণ – প্রয়োজনীয় anesthesia/analgesia দেওয়া হয়।
- ধাপ ৩: জীবাণুমুক্তকরণ – অপারেশনের স্থান যথাযথভাবে পরিষ্কার ও জীবাণুমুক্তকরণ করা হয়।
- ধাপ ৪: Foreskin আলাদা করা – লিঙ্গের মাথা ও foreskin-এর মধ্যকার স্বাভাবিক সংযোগ থাকলে উপযুক্ত পদ্ধতিতে আলাদা করা হয়।
- ধাপ ৫: অতিরিক্ত foreskin অপসারণ – নির্ধারিত surgical technique অনুযায়ী foreskin-এর প্রয়োজনীয় অংশ অপসারণ করা হয়।
- ধাপ ৬: রক্তপাত নিয়ন্ত্রণ – প্রয়োজন অনুযায়ী bleeding control করা হয়।
- ধাপ ৭: ক্ষত বন্ধ করা – বয়স ও surgical technique অনুযায়ী absorbable suture দিয়ে সেলাই করা হয়। এই সেলাই কাটার প্রয়োজন হয়না।
খতনার কোন পদ্ধতিটি সবচেয়ে ভালো ?
অভিভাবকরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করেন— “কোন ডিভাইস/পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো?”
বাস্তবে একটি পদ্ধতি সব শিশুর জন্য সেরা নয়। বিভিন্ন বয়স ও পরিস্থিতিতে বিভিন্ন surgical technique বা device ব্যবহার করা যেতে পারে। একজন শিশু সার্জন বাচ্চার সকল বিষয় বিবেচনা করে সঠিক পদ্ধতিটি নির্বাচন করেন।
শুধু “দ্রুত” বা “কম খরচে” হওয়াই ভালো খতনার মাপকাঠি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—
প্রশিক্ষিত চিকিৎসক + সঠিক রোগী নির্বাচন + জীবাণুমুক্ত পরিবেশ + যথাযথ ব্যাথা নিয়ন্ত্রণ + সঠিক ফলো-আপ।
অপারেশনের পর শিশুর কী কী স্বাভাবিক লক্ষণ হতে পারে?
খতনার পর কিছু পরিবর্তন স্বাভাবিক। যেমন –
- সামান্য ফোলা
- হালকা লালচে ভাব
- সামান্য ব্যথা বা অস্বস্তি
- সামান্য পরিমাণ পানি পরা
- লিঙ্গের মাথা কিছুটা বেশি সংবেদনশীল হওয়া
এসব সাধারণত ধীরে ধীরে কমে যায়। তবে রক্তপাত বন্ধ না হলে, প্রস্রাব না হলে বা জ্বর/পুঁজ হলে তা স্বাভাবিক ধরে নেওয়া উচিত নয়।
খতনার পর শিশুর যত্ন কীভাবে করবেন?
- ক্ষত পরিষ্কার রাখুন – চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিষ্কার ও শুকনো রাখুন।
- ডায়াপার ব্যবহার করলে – ছোট শিশুর ক্ষেত্রে diaper পরিবর্তন নিয়মিত করুন এবং ক্ষতস্থানে মল বা প্রস্রাব লেগে থাকলে চিকিৎসকের নির্দেশ অনুযায়ী পরিষ্কার করুন।
- ওষুধ – চিকিৎসক যে pain medicine বা অন্য কোনো ওষুধ দিয়েছেন, তা নির্ধারিত মাত্রায় দিন।
- ক্ষত নাড়াচাড়া করবেন না – নিজে থেকে শুকনো চামড়া, crust বা stitch টেনে তুলবেন না।
- Tight clothing এড়িয়ে চলুন – আরামদায়ক পোশাক ব্যবহার করুন।
- কোনো ঘরোয়া উপাদান ব্যবহার করবেন না – নিজে থেকে তেল, পাউডার, ছাই, ভেষজ উপাদান বা অন্য কোনো পদার্থ ক্ষতস্থানে লাগাবেন না, যদি চিকিৎসক নির্দেশ না দেন।
খতনার পর কতদিনে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়?
সুস্থ হতে শিশুভেদে কিছুটা পার্থক্য হতে পারে। সাধারণভাবে—
- প্রথম ১–৩ দিন – সামান্য ব্যথা, ফোলা বা অস্বস্তি থাকতে পারে।
- প্রথম সপ্তাহ – ক্ষত ধীরে ধীরে শুকাতে শুরু করে।
- ১–২ সপ্তাহ – বেশিরভাগ শিশু স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফিরে যেতে পারে।
- ২–৪ সপ্তাহ – ক্ষত আরও ভালোভাবে সেরে ওঠে।
- সম্পূর্ণ healing – অনেক শিশুর ক্ষেত্রে কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। বয়স, পদ্ধতি এবং শিশুর healing-এর ওপর সময় নির্ভর করে।
খতনার পর কখন দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাবেন?
নিচের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন—
🚨 রক্তপাত বন্ধ না হওয়া
🚨 বারবার বা বেশি পরিমাণে রক্ত পড়া
🚨 শিশুর প্রস্রাব না হওয়া বা প্রস্রাব করতে খুব কষ্ট হওয়া
🚨 অতিরিক্ত ফোলা
🚨 পুঁজ বা দুর্গন্ধযুক্ত তরল বের হওয়া
🚨 জ্বর
🚨 ক্ষত খুলে যাওয়া
🚨 ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকা
🚨 লিঙ্গের মাথার রং অস্বাভাবিকভাবে কালচে/নীলচে হয়ে যাওয়া
খতনা কি ভবিষ্যতে কোনো সমস্যা তৈরি করে?
সঠিকভাবে এবং যথাযথ surgical technique ব্যবহার করে খতনা করা হলে অধিকাংশ শিশুর দীর্ঘমেয়াদে কোনো উল্লেখযোগ্য সমস্যা হয়না।তবে ভুল পদ্ধতি, অনভিজ্ঞ হাতে করা, অতিরিক্ত চামড়া কেটে ফেলা, সংক্রমণ বা ক্ষতজনিত সমস্যার কারণে কিছু শিশুরপরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। তাই—খতনা ছোট অপারেশন হলেও “যে কেউ করলেই হবে”—এমন একটি প্রক্রিয়া নয়। সেজন্য শিশুর নিরাপত্তাই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।
প্রচলিত ভুল ধারণা — মিথ বনাম সত্য
❌ মিথ ১: ছোট বাচ্চার ব্যথা লাগে না।
✅ সত্য: শিশুরা ব্যথা অনুভব করে। তাই যথাযথ ব্যথা নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
❌ মিথ ২: খতনার আগে কোনো পরীক্ষা বা ডাক্তার দেখানোর দরকার নেই।
✅ সত্য: শিশুর লিঙ্গের গঠন, শারীরিক অবস্থা এবং bleeding history সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
❌ মিথ ৩: যেকোনো জায়গায়/হাজাম দিয়ে খতনা করানো যায়।
✅ সত্য: খতনা একটি সার্জারি। প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, sterile technique এবং নিরাপদ পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
❌ মিথ ৪: বেশি চামড়া কাটলেই খতনা ভালো হয়।
✅ সত্য: অতিরিক্ত বা অপর্যাপ্ত skin removal—দুটিই সমস্যা তৈরি করতে পারে।
❌ মিথ ৫: শিশুর foreskin পিছনে না গেলে অবশ্যই রোগ হয়েছে।
✅ সত্য: ছোট ছেলে শিশুর foreskin স্বাভাবিকভাবেই পুরোপুরি পিছনে নাও যেতে পারে।
❌ মিথ ৬: ঘরোয়া তেল বা ভেষজ উপাদান লাগালে দ্রুত শুকিয়ে যায়।
✅ সত্য: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো পদার্থ ক্ষতস্থানে ব্যবহার করা উচিত নয়।
অভিভাবকদের সাধারণ প্রশ্ন — FAQ
১. খতনা করার জন্য কোন বয়স সবচেয়ে ভালো?
সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট বয়স নেই। শিশুর বয়স, স্বাস্থ্য, শারীরিক গঠন ও পদ্ধতির ওপর সিদ্ধান্ত নির্ভর করে।
২. খতনা কি খুব ব্যথার?
অ্যানেস্থেসিয়া ও যথাযথ pain control ব্যবহার করলে ব্যথা ও অস্বস্তি অনেকটাই কমানো যায়।
৩. খতনার আগে কি রক্ত পরীক্ষা করতে হবে?
সব সুস্থ শিশুর ক্ষেত্রে নয়। তবে bleeding disorder-এর ইতিহাস বা অন্য কোনো সন্দেহ থাকলে পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
৪. শিশুর foreskin পিছনে যায় না—খতনা করাতে হবে?
সবসময় নয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে foreskin পুরোপুরি retract না হওয়া স্বাভাবিক হতে পারে।
৫. খতনা করলে কি Phimosis আর হবে না?
খতনা foreskin-সম্পর্কিত কিছু সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে, তবে সব ধরনের foreskin সমস্যা একইভাবে চিকিৎসা করতে হয় না।
৬. খতনার পর কতদিন ব্যথা থাকে?
সাধারণত প্রথম কয়েকদিন অস্বস্তি বেশি থাকে এবং ধীরে ধীরে কমে যায়।
৭. খতনার পর কতদিনে শিশু স্বাভাবিক হয়?
অনেক শিশু কয়েকদিনের মধ্যেই স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ফিরে আসে। সম্পূর্ণ wound healing-এর জন্য আরও বেশি সময় লাগতে পারে।
৮. খতনার পর রক্তের দাগ দেখা গেলে কি চিন্তার কারণ?
সামান্য দাগ হতে পারে। তবে রক্তপাত চলতে থাকলে বা বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
৯. খতনার পর প্রস্রাব না হলে কী করব?
এটি অবহেলা করবেন না। শিশুকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে।
১০. খতনার পর গোসল করা যাবে?
চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুযায়ী। ক্ষতস্থানের ধরন ও dressing-এর ওপর সময় নির্ভর করে।
১১. খতনার পর সেলাই কাটতে হয়?
অনেক ক্ষেত্রে absorbable suture ব্যবহার করা হয়, যা নিজে থেকেই গলে যায়। কোন ধরনের suture ব্যবহার করা হয়েছে তার ওপর নির্ভর করে।
১২. খতনার পর আবার অপারেশন লাগতে পারে?
বেশিরভাগ শিশুর ক্ষেত্রে লাগে না। তবে bleeding, infection, skin problem বা অন্য কোনো complication হলে অতিরিক্ত চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
১৩. Hypospadias থাকলে খতনা করা যাবে?
সাধারণত আগে শিশু সার্জনের মূল্যায়ন করা উচিত। কারণ ভবিষ্যৎ corrective surgery-তে foreskin-এর tissue প্রয়োজন হতে পারে।
১৪. খতনা কি অবশ্যই হাসপাতালেই করতে হবে?
নিরাপদ surgical environment, sterile technique এবং trained practitioner থাকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় করা হবে তা শিশুর অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
১৫. কোন পদ্ধতিতে খতনা সবচেয়ে ভালো?
একটি পদ্ধতি সব শিশুর জন্য সেরা নয়। শিশুর বয়স, anatomy, চিকিৎসকের দক্ষতা ও নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে পদ্ধতি নির্বাচন করা উচিত।
সংক্ষেপে মনে রাখুন
✅ খতনা হলো foreskin-এর একটি অংশ অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে অপসারণ।
✅ বাংলাদেশে এটি প্রধানত ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে করা হয়; কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসাগত কারণও থাকতে পারে।
✅ ছোট শিশুর foreskin পুরোপুরি পিছনে না যাওয়া সবসময় রোগ নয়।
✅ খতনার আগে শিশুর লিঙ্গের গঠন পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ।
✅ Hypospadias বা অন্য কোনো penile abnormality থাকলে আগে শিশু সার্জনের পরামর্শ নিন।
✅ খতনার সময় যথাযথ pain control দেওয়া উচিত।
✅ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এবং sterile environment অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
✅ সামান্য ফোলা বা অস্বস্তি স্বাভাবিক হতে পারে।
✅ অতিরিক্ত রক্তপাত বা প্রস্রাব বন্ধ হয়ে যাওয়া স্বাভাবিক নয়।
✅ সময়মতো সঠিক চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ শিশু ভালোভাবে সুস্থ হয়ে ওঠে।
লেখক পরিচিতি
ডাঃ প্রসেনজিৎ দত্ত
এমবিবিএস, বিসিএস (স্বাস্থ্য), এমএস (শিশু সার্জারি)
শিশু সার্জারি বিশেষজ্ঞ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
ডা. প্রসেনজিৎ দত্ত শিশু ও নবজাতকদের বিভিন্ন জন্মগত এবং অর্জিত সার্জিক্যাল সমস্যার চিকিৎসায় নিয়োজিত। তাঁর আগ্রহের ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে শিশুদের হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, অণ্ডকোষ না নামা, শিশুদের ইউরোলজিক্যাল সমস্যা, নবজাতকের জন্মগত ত্রুটি এবং অন্যান্য শিশু সার্জারি।
আপনার শিশুর খতনা করানোর আগে পরামর্শ নিন
আপনার শিশুর খতনা করার পরিকল্পনা থাকলে এবং কোন বয়সে করা ভালো, কোন পদ্ধতি উপযুক্ত, অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োজন কি না, শিশুর কোনো জন্মগত সমস্যা আছে কি না অথবা খতনার পর কোনো সমস্যা দেখা দিলে কী করতে হবে—এসব বিষয়ে পরামর্শের জন্য একজন শিশু সার্জনের সঙ্গে আলোচনা করুন।
শিশুর নিরাপত্তা এবং আরামকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে খতনা করানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. প্রসেনজিৎ দত্তের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য যোগাযোগ করুন।