Dr. Prosenjit Datta

হঠাৎ শিশুর পেটের ব্যাথা সাথে বমি বমি ভাবঃ অ্যাপেন্ডিসাইটিস?

শিশুদের খুবই কমন একটি সমস্যা যা অনেক সময় শিশুদের অবর্ণনীয় কষ্টের কারণ হয়ে দাড়ায় বাবা-মায়ের শুধু একটু সচেনতনতার অভাবে

অ্যাপেন্ডিসাইটিস আসলে কী?

শিশুদের পেট ব্যথা একটি অত্যন্ত সাধারণ ঘটনা। অতিরিক্ত খাওয়া, গ্যাস বা বদহজমের কারণে প্রায়ই শিশুরা পেট ব্যথার অভিযোগ করে। কিন্তু সব পেট ব্যথা সাধারণ নয়। শিশুর পেট ব্যথা যদি হঠাৎ শুরু হয় এবং তা ক্রমশ বাড়তে থাকে, তবে তা অ্যাপেন্ডিসাইটিস হতে পারে, যা একটি মেডিকেল ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা। মানুষের পেটের ডান দিকের নিচের অংশে বৃহদান্ত্রের (বড় নাড়িভুঁড়ি) সাথে যুক্ত আঙুলের মতো ছোট একটি নালি থাকে, যাকে ‘অ্যাপেন্ডিক্স’ বলা হয়। মানবদেহে এর তেমন কোনো বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ কাজ নেই। কিন্তু কোনো কারণে যদি এই ছোট নালিটিতে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণুর সংক্রমণ হয় এবং এটি ফুলে ওঠে ও প্রদাহের সৃষ্টি হয়, তখন সেই যন্ত্রণাদায়ক অবস্থাকেই বলা হয় অ্যাপেন্ডিসাইটিস (Appendicitis)। এটি যেকোনো বয়সেই হতে পারে, তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।

কেন শিশুদের অ্যাপেন্ডিসাইটিস হয়?

অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার মূল কারণ হলো অ্যাপেন্ডিক্সের সরু নালিপথটি কোনো কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া। শিশুদের ক্ষেত্রে এই পথ বন্ধ হওয়ার সবচেয়ে সাধারণ কারণ হলো শক্ত মলের টুকরো বা পাথর (Fecolith) গিয়ে নালির মুখটি আটকে দেওয়া। এছাড়া অনেক সময় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণের কারণে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরের গ্রন্থিগুলো ফুলে গিয়েও এই পথটি বন্ধ করে দিতে পারে। কখনো কখনো কৃমি বা অপাচ্য ফলের বিচিও এর জন্য দায়ী হতে পারে। একবার যখন নালির মুখটি বন্ধ হয়ে যায়, তখন অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতরে থাকা ব্যাকটেরিয়াগুলো খুব দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে শুরু করে। এর ফলে অ্যাপেন্ডিক্সের ভেতর পুঁজ জমতে থাকে, এটি ফুলে বেলুনের মতো হয়ে যায় এবং ভেতরে প্রচুর চাপ তৈরি হয়। এই অতিরিক্ত চাপের কারণেই প্রচণ্ড ব্যথার সৃষ্টি হয়।

সাধারণ পেট ব্যথা আর অ্যাপেন্ডিসাইটিসের পার্থক্য বুঝবেন কীভাবে?

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের লক্ষণগুলো খুবই নির্দিষ্ট এবং সাধারণত একটি নির্দিষ্ট নিয়মে প্রকাশ পায়। শুরুতে শিশুর ব্যথাটা সাধারণত নাভির চারপাশে হালকাভাবে শুরু হয়। শিশু হয়তো বলতে পারে না ঠিক কোথায় ব্যথা করছে। কিন্তু কয়েক ঘণ্টা পার হওয়ার সাথে সাথে এই ব্যথা ধীরে ধীরে পেটের ডান দিকের নিচের অংশে (Right iliac fossa) গিয়ে স্থির হয় এবং ব্যথার তীব্রতা মারাত্মক আকার ধারণ করে। শিশু ব্যথায় সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না, কুঁকড়ে শুয়ে থাকতে চায়। হাঁটাচলা করলে, জোরে শ্বাস নিলে বা কাশলে ব্যথা আরও বেড়ে যায়। পেট ব্যথার পাশাপাশি শিশুর বমি ভাব বা বারবার বমি হতে পারে। খাবারে সম্পূর্ণ অরুচি দেখা দেয় এবং হালকা জ্বর (সাধারণত ১০০-১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট) থাকে। আপনি যদি পেটের ডান দিকের নিচের অংশে আলতো করে চাপ দেন, শিশু ব্যথায় চিৎকার করে উঠতে পারে। এমনকি চাপ দিয়ে হাত সরিয়ে নিলেও তীব্র ব্যথা অনুভূত হয়।

চিকিৎসা পদ্ধতি: এর কি কোনো বিকল্প চিকিৎসা আছে?

অ্যাপেন্ডিসাইটিস নিশ্চিত হলে এর একমাত্র এবং সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা হলো অপারেশন বা সার্জারির মাধ্যমে ফুলে যাওয়া এবং ইনফেকশনযুক্ত অ্যাপেন্ডিক্সটি শরীর থেকে কেটে বের করে ফেলা। একে বলা হয় ‘অ্যাপেন্ডিসেকটমি’ (Appendectomy)। ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সাময়িকভাবে হয়তো ব্যথা কমানো যায়, কিন্তু এতে অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই যত দ্রুত সম্ভব সার্জারি করা উচিত। বর্তমানে শিশুদের ক্ষেত্রে এই সার্জারিটি প্রধানত অত্যাধুনিক ল্যাপারোস্কোপিক (Laparoscopic) পদ্ধতিতে করা হয়। এই পদ্ধতিতে পেট কাটার কোনো প্রয়োজন হয় না। পেটে ছোট ছোট তিনটি ফুটো করে ক্যামেরা এবং বিশেষ যন্ত্রপাতির সাহায্যে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে বের করে আনা হয়। ল্যাপারোস্কোপিক সার্জারির সুবিধা হলো এতে শিশুর কষ্ট কম হয়, পেটে বড় কোনো দাগ থাকে না এবং শিশু মাত্র এক বা দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে ছুটি পেয়ে বাড়ি চলে যেতে পারে। তবে অবস্থা খুব জটিল হলে সার্জন ওপেন সার্জারি বা পেট কেটে অপারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

চিকিৎসা না করালে বা দেরি করলে কী হতে পারে?

অ্যাপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে সময়ই হলো সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। লক্ষণ শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক চিকিৎসা না হলে ফুলে থাকা অ্যাপেন্ডিক্সটি অতিরিক্ত চাপে ফেটে যেতে পারে (Ruptured Appendix)। এটি একটি অত্যন্ত ভয়ংকর পরিস্থিতি। অ্যাপেন্ডিক্স ফেটে গেলে ভেতরের সমস্ত পুঁজ, মল এবং জীবাণু পুরো পেটের ভেতর ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে পুরো পেটে মারাত্মক ইনফেকশন তৈরি হয়, যাকে ‘পেরিটোনাইটিস’ (Peritonitis) বলে। তখন শিশুর সারা পেট ফুলে যায়, প্রচণ্ড জ্বর আসে, বারবার বমি হয় এবং রক্তে ইনফেকশন ছড়িয়ে পড়ে শিশুর জীবন সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে। এই অবস্থায় সার্জারি করা অনেক জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায় এবং শিশুকে দীর্ঘ সময় আইসিইউ বা হাসপাতালে থাকতে হতে পারে।

অ্যাপেন্ডিক্স ছাড়া শিশু কি সুস্থভাবে বাঁচতে পারবে?

অনেক বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন থাকে, অ্যাপেন্ডিক্স কেটে ফেললে ভবিষ্যতে শিশুর কোনো সমস্যা হবে কি না। এর উত্তর হলো—একেবারেই না। আগেই বলা হয়েছে, মানবদেহে অ্যাপেন্ডিক্সের কোনো অপরিহার্য কাজ নেই। এটি কেটে ফেলে দিলে শিশুর হজমশক্তি, শারীরিক বৃদ্ধি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর কোনো ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে না। সফল অপারেশনের পর শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আর কখনোই অ্যাপেন্ডিসাইটিস হওয়ার ভয় থাকে না।

পিতামাতার জন্য শিক্ষা: অবহেলা নয়, প্রয়োজন তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা

শিশুর পেট ব্যথাকে কখনোই সাধারণ গ্যাস বা বদহজম ভেবে অবহেলা করবেন না বা নিজে থেকে ব্যথার ওষুধ খাইয়ে ব্যথা কমিয়ে রাখার চেষ্টা করবেন না। ব্যথার ওষুধ আসল রোগকে লুকিয়ে রাখে, যা পরে ভয়ংকর রূপ নিতে পারে। আপনার দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্তই বাঁচাতে পারে আপনার অমূল্য রতনকে।

পেডিয়াট্রিক সার্জনের ভূমিকা

শিশুদের পেট ব্যথার সঠিক কারণ নির্ণয় করা একটি চ্যালেঞ্জিং কাজ। একজন দক্ষ পেডিয়াট্রিক সার্জন অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শিশুর লক্ষণগুলো পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আল্ট্রাসনোগ্রাম বা রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে রোগ নির্ণয় করেন। এরপর অত্যাধুনিক সার্জারির মাধ্যমে তিনি শিশুর দ্রুত ও নিরাপদ আরোগ্য নিশ্চিত করেন, যাতে আপনার সন্তান আবার তার প্রাণবন্ত হাসিতে চারপাশ ভরিয়ে তুলতে পারে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top